একটি দেশের সংবিধানকে সে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জনগণের জীবনাচার, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় চরিত্রের সমষ্টি হিসেবে মনে করা হয়। সংবিধানকে দেখলেই একটি দেশটির সার্বিক বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করা যায়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া বর্তমান সংবিধানকে তৎকালীন সময়ের নিরিখে একটি অনন্য সংবিধান হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এটি যাত্রা শুরু করে কিছু প্রশ্নকে ধারণ করে। প্রণয়নের শুরু থেকেই এই সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে ‘নির্বাচিত একনায়ক’ এবং রাষ্ট্রপতিকে ‘ক্ষমতাহীন শিখণ্ডী’ হওয়ার সব পথ উন্মুক্ত করে রাখে। আর ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদটি প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়নকে পরিণত হতে থাকে। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির এক সাক্ষাৎকার বিষয়টি নিয়ে তাত্ত্বিকদের আরও একবার ভাবিয়েছে। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “গত তিনমাস ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করতে গেলে উনি আমার সালাম নিতেন না। তো আমি দেখতাম যে উনার চরণের ধুলো আমি পাই না। ... সেই সময় যে উনার মনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার নাম প্রোথিত হয়ে গেছে এবং সেজন্যই যে উনি আমার সালাম নেওয়াটা বিব্রতকর মনে করতেন তা আজ বুঝলাম....” কী সাংঘাতিক কথা! রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ক্রমে যিনি এক নম্বর অবস্থানে, তার সাথে নির্বাহী প্রধানের সম্পর্ক “চরণের ধুলো” নেওয়ার। আর সেটা রাষ্ট্রপতি ঘটা করে এবং গর্বের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বর্ণনাও করছেন!
সংবিধান সম্পর্কিত আলোচনা, অধ্যয়ন এবং বিভিন্ন সেমিনার-সিম্ফোজিয়ামের আলোচনা থেকে জানা যায়, স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়েই শুরু হয় সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করার প্রক্রিয়া। যা পরবর্তী ৪৬ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সংবিধানটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সংশোধন করা হয়েছে একাধিকবার! ক্ষমতার আসন থেকে যখন, যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই সংবিধানকে কেটেছেন, জুড়েছেন বা সংশোধন করেছেন। এ প্রসঙ্গে আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল হক অষ্টম সংশোধনীর কিছু অন্তরালের কথা বর্ণনা করেছিলেন। অষ্টম সংশোধনী হিসেবে সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের উপ-অনুচ্ছেদ ক সংযোজিত করা হয়। প্রথম পর্যায়ে যেখানে বলা হয়েছিল, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”। এই সংবাদ দেখে ব্যারিস্টার রফিবুল হক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি উদ্বেগের সাথে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “মওদুদ এটা করেছ কী? কেলেঙ্কারি হবে। এত ধর্মের লোক আমাদের, তোমরা এটা কী করেছ?” তখন প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ উত্তর দেন রাষ্ট্রপতি তো এটাই বলে দিয়েছেন। এরপর ব্যারিস্টার হক মালয়েশিয়ার সংবিধান দেখিয়ে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করলে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পাসকৃত সংবিধানের ফাঁকা স্থানটিতে সংযোজন করে দিলেন, “তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে”। এভাবেই শাসকগণ সংবিধানকে ইচ্ছামাফিক পরিবর্তন করেছেন। আর ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য তারা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে এই সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছেন। কালক্রমে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানটি হয়ে উঠেছে স্বেচ্ছাচার তৈরির পথ নির্দেশক।
বিগত দেড় দশকের শাসনকাল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, সংবিধানকে সামনে রেখে কীভাবে সদ্য ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রী দোর্দাণ্ড প্রতাপশালী একনায়ক হয়ে উঠেছিলেন। ভোট ছাড়াই জাতীয় সংসদের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ, দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন করা, ডামি নির্বাচনের আয়োজন করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করাসহ সব অনিয়মের বৈধতা দেয় বিদ্যমান সংবিধান। দেশকে ও দেশের মানুষকে শোষণ করার জন্য আমলাতন্ত্রকে পরিণত করা হয় শোষণের যন্ত্র হিসেবে। আমলাতন্ত্র হয়ে ওঠে একটি সর্বভুক ও গণবিরোধী সংগঠন। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অন্যায়, দুর্নীতি, লুটপাট ও বিচারহীনতার এ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলোর অপকর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পুলিশকে ব্যবহার করা হয় প্রহরী হিসেবে। এভাবেই রাষ্ট্রের সবকটি প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির কাছে সঁপে দেওয়া হয়েছে। শেষের দেড় দশকে স্বেচ্ছাচারের মাত্রা চরম মাত্রায় পৌঁছালে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জন-মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে, গত জুলাই-আগস্টে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে একাত্মতা প্রকাশ করেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ। রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে স্বেচ্ছাচারের পথকে রুদ্ধ করে দেয় এদেশের ছাত্র-জনতা। তারুণ্যের শক্তির কাছে পর্যুদস্ত হয়ে পতিত স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
যে জাতিকে ১৯৭১ সালে বিদেশি শক্তির সাথে যুদ্ধ করে রক্তের সাগর পেরিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে হয়েছ, তাদেরই ২০২৪ সালে স্বজাতির সশস্ত্র দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে খালি হাতে লড়াই করে দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের পর মানুষ আর সেই দুর্বিসহ অবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। জনপ্রতিনিধিদের রক্তচোষা, পিশাচ ও স্বেচ্ছাচার হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে চায়। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা প্রকৃত অর্থে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চতকরণের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা সমুন্নত হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। আরও চায় সরকারি দপ্তরে ঘুষ ও দুর্নীতি, জাতীয় সম্পদ পাচার, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদকের মতো অভিশাপ থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা।
বিভিন্ন পর্যায় থেকে জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের বিষয়ে চমৎকার সব প্রস্তাবনা আসছে। সরকার ও তার বিভিন্ন বিভাগের পুনর্গঠন নিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রতিনিয়ত আলোচনার টেবিলে, সেমিনার ও সিম্ফোজিয়ামে তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হচ্ছে। দ্বিকক্ষ-বিশিষ্ট আইনসভা, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের সংস্কার, রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, পুলিশ ও জন-প্রশাসনকে দুর্নীতির কবল থেকে মুক্ত করে ঢেলে সাজানো এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে গণ-আকাঙ্ক্ষা অনুসারে পুনর্গঠন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে আবির্ভূত হয়েছে তা হলো- বিদ্যমান সংবিধানের মাধ্যমে কি জনগণের সকল আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব?
এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিশ্লেষকই বিদ্যমান সংবিধান সংরক্ষণের পক্ষে কথা বলেননি। তবে আবারও প্রশ্ন উত্থাপিত হয় বর্তমান সংবিধানের সংশোধন নাকি পুনর্লিখনের মাধ্যমে সেই আকাঙ্ক্ষাসমূহের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে? এই প্রেক্ষিতে সর্বপ্রথম এবং বিস্তারিত আলোকপাত করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ। তিনি মনে করেন বর্তমান দেশের এই সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের গ্রহণযোগ্য উপায় হচ্ছে সংবিধানের পুনর্লিখন।
সাংবিধানিক সংকট যখন সহজে সমাধানযোগ্য হয়, তখন এর মাধ্যমে সেই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট এমনই একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে যে তার গুটিকয়েক অনুচ্ছেদ, এমনকি কয়েকটি ভাগকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করলেও এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। আইনসভার পুনর্গঠন, নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, জুলাই অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা এবং সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক কাঠামোসহ নানাবিধ বিষয়ের পরিবর্তন, সংযোজন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণ বর্তমান সংবিধানের অধীনে একেবারেই অসম্ভব। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই সংবিধান ভবিষ্যতেও ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ বন্ধ করতে তো পারবেই না, বরং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সমৃদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের শাসকরা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে বহুগুণে উৎসাহিত হবে।
সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করলে প্রসঙ্গটি সম্পর্কে বারবার একটিই সিদ্ধান্ত আসবে, সেটি হলো সংবিধান পুনরায় লেখার কোনো বিকল্প নেই। আর এটি কোনো নজিরবিহীন ঘটনা নয়। সময়ের প্রয়োজনে নিজেদের সংবিধান পুনরায় রচনা করেছে ফ্রান্স, স্পেন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র।
বাংলাদেশের সংবিধান পুনরায় লিখতে গেলে যে বর্তমান সংবিধানটির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাদ দিয়ে রচনা করতে হবে তা নয়, বরং ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল বক্তব্য তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার হবে প্রস্তাবিত নতুন সংবিধানের ভিত্তি। যেহেতু বিদ্যমান সংবিধানটিকে গত অর্ধশতক ধরে শাসকেরা একটু একটু করে ধ্বংসের তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে এবং যেহেতু পরিবর্তিত সময়ের চাহিদার প্রেক্ষাপট ও গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজনে সংবিধান পুনর্লিখনের আর কোনো বিকল্প নেই, সেহেতু কোন প্রক্রিয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন হবে সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত। স্বীকৃত চারটি পদ্ধতির মধ্যে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত একটি গণপরিষদ গঠন করে এবং সেখানে দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সংবিধান বিশেষজ্ঞগণকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান পুনর্লিখিত হোক না কেন সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রামদিয়া সরকারি শ্রীকৃষ্ণ কলেজ, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ