‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’—ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এমন গুজবের জের ধরে এবার প্রাণ গেল সন্দেহভাজন এক যুবকের। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে ঐ যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা। নিহতের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। এদিকে গুজবে বিভ্রান্ত মানুষকে সচেতন করতে গতকাল বুধবার ঐ এলাকায় মাইকিং করেছে পুলিশ।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি জিজি বিশ্বাস বলেন, গণপিটুনির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ঐ যুবককে উদ্ধার করে। তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করেন চিকিত্সক। স্থানীয়ভাবে তার নাম-পরিচয় না পাওয়ায় আঙুলের ছাপ দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে আহত যুবককে উদ্ধারকারী মোহাম্মদপুর থানার এসআই বুলবুল আহমেদ জানান, চাঁদ উদ্যান এলাকায় নিম্ন-আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের মধ্যে সচেতনতাও কম। পদ্মা সেতু নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে তাদের অনেকেই নিজেদের সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কিত। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে অপরিচিত এক যুবক ঐ এলাকার এক শিশুকে ডেকে কথা বলে। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে সন্দেহ হয় অভিভাবকদের। তারা ধরেই নেন শিশুটিকে অপহরণের উদ্দেশ্যে এসেছে সেই যুবক। মুহূর্তে তাকে ছেলেধরা আখ্যা দিয়ে মারধর শুরু হয়। কিল-ঘুষির পাশাপাশি ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয় তার মাথা। খবর পেয়ে রাত ৯টার দিকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আনুমানিক ২৫ বছর বয়সি ঐ যুবকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথা ও চোখের নিচে ছিল গভীর জখম। তার পরনে ছিল ট্রাউজার ও টি-শার্ট।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো জানান, প্রকৃতপক্ষে নিহত যুবক অপরাধী কি না, তিনি কোন উদ্দেশ্যে ঐ এলাকায় গিয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। এমনকি কোন শিশুর সঙ্গে তিনি কথা বলেছিলেন তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যায় এলাকাবাসীর অনেকের সংশ্লিষ্টতা থাকায় কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। তারপরও কয়েকজনের কাছ থেকে ঘটনার ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে বিস্তারিত বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আপাতত নিহতের পরিচয় পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ। তার পরিচয় পেলে তদন্তের পথ সুগম হবে।
এদিকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর গতকাল দিনভর চাঁদ উদ্যানসহ আশপাশের এলাকায় দুইটি মাইক দিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে। প্রচারণায় বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু ঘিরে গুজবের কোনো ভিত্তি নেই। এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখে সন্দেহ হলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিন। কোনোভাবেই সন্দেহের বশে কাউকে মারধর করা উচিত নয়। এর আগে মঙ্গলবার পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পস্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব, এর কোনো সত্যতা নেই।’