কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক এবং লোক প্রশাসন বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি ও ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শিক্ষকতা জীবনের শুরু করেন ১৯৯৮ সালে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে। এরপর সেখান থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে ২০০৭ সালে যোগদান করেন। একই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসাবে প্রায় ১২ বছর, ভর্তি পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের প্রাধ্যক্ষ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে এই গুণী শিক্ষকের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে ৭টি বই, ১১টি আর্টিকেল ও ৮টি কনফারেন্স পেপার প্রকাশিত হয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার ভাবনা ও কর্ম-পরিকল্পনার বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মানছুর আলম অন্তর।
ইত্তেফাক: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফলে দেশের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং এই আন্দোলনে কুবি শিক্ষার্থীদের অবদানকে কিভাবে দেখছেন?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম রক্তাক্ত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কুমিল্লাকে সংগঠিত করেছে। তাই তাদের অবদান অনন্যসাধারণ। আমাদের শিক্ষার্থী আবদুল কাইয়ুম শাহাদাত বরণ করেন লংমার্চে গিয়ে। এছাড়াও অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আহত হয়েছে। এই সাহসী বীরদের ইতিহাস আমি মনে করি লিপিবদ্ধ থাকা দরকার।
আর ছাত্র-জনতা যে বৈপ্লবিক আন্দোলন করেছে তা পৃথিবীতে বিরল। এই আন্দোলনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাদের জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করুক। যারা বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় আছেন তাদের আরোগ্য কামনা করি। গোটা জাতি এদের কাছে দায়বদ্ধ। তাই আমরা যার যার অবস্থান থেকে যদি সঠিক দায়িত্বপালন করি তাহলে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। আমরা বাংলাদেশকে নতুন ভাবে নির্মাণ করতে পারবো।
ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থেকে আপনিই প্রথম প্রশাসনিক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে এসেছেন। এই বিষয়ে আপনার অনুভূতি কি?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই আমি আছি। প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্বপালন করেছি। তাই এই ক্যাম্পাসের বাস্তবতা সম্পর্কে আমার ভালো জানাশুনা রয়েছে। বর্তমানে যেখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, সবার সহযোগিতা পেলে ভালো কিছু করতে চাই।
ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে কোন জায়গাগুলোতে ফোকাস করা উচিত বলে মনে করেন?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় নয় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফোকাসের জায়গা হল শিক্ষা ও গবেষণা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু তুলনামূলক নতুন তাই শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়ক সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলা এবং শিক্ষকদের সবরকমের সুযোগ, সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিকট কোন ধরনের প্রত্যাশা করেন ?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: শিক্ষকরা যার যার অবস্থান থেকে প্রত্যেকেই অভিভাবক। এখানে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একটা প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এই দায়িত্বপালনে যদি আমরা প্রত্যয়ী হই সুন্দর প্রজন্ম পাবো। যারা দেশের ভবিষ্যৎ। তাই সবার কাছে প্রত্যাশা যার যার অবস্থান থেকে সেই অভিভাবকত্বটুকু পালন করবেন।
ইত্তেফাক: এতদিন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন প্রশাসক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতা ফেস করতে হচ্ছে আপনার?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: আমাদের প্রশাসনের এখনো একমাসও পেরোয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা বা জটিলতা ফেস করতে হয়নি আমার। সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। সামনেও এই সহযোগিতা পেয়ে যাবো প্রত্যাশা করি।
ইত্তেফাক: আগের প্রো-ভিসি স্যার অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো দেখভাল করতেন। সেক্ষেত্রে আপনি যদি একই দায়িত্ব পালন করেন তাহলে শিক্ষকদের পদোন্নতি বা স্থায়ীকরণ নিয়ে পূর্বের প্রশাসনের যে জটিলতা রয়েছে, তা নিরসনে কি ভাবছেন?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু প্রো-ভিসি পদ একটিই তাই আমাকে অ্যাকাডেমিক এবং প্রশাসনিক উভয় দিকই দেখতে হয়। প্রশাসনিক দায়িত্বপালন হল টিম ওয়ার্ক। আমরা ভিসি স্যারের নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি। আর সবগুলো বিষয়ই দেখভাল করছি। চেষ্টা করবো বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নিয়ম নীতির মধ্যে নিয়ে আসার। যোগ্য ব্যক্তিকে বঞ্চিত করলে প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার যা প্রাপ্য তাকে অবশ্যই তা দিতে হবে। ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। আমরা চাই, দক্ষতা এবং যোগ্যতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ হোক।
ইত্তেফাক: বর্তমান প্রশাসনকে নির্দিষ্ট একটি দলের ট্যাগ দেয়া হয় এই বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী? এছাড়াও ভিন্নমতাদর্শের এবং বিগত সরকারের সাথে কাজ করা শিক্ষকদের প্রতি আপনাদের বার্তা কি?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: আমি এই ট্যাগের বিষয়ে জানিনা। আমরা বর্তমানে বিপ্লবোত্তর সময়ের মধ্যে আছি। এখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের নিয়োগ দিয়েছে। যেটা কোনো দলীয় নয়। সবার কাছে প্রত্যাশা থাকবে, আমাদের সাথে একযোগে কাজ করবে। একজন শিক্ষক যে আদর্শেরই হোক, আমাদের সাথে কাজ করতে চাইলে অবশ্যই আমরা তাদের সুযোগ দিবো। দলীয় মতাদর্শ ভিন্ন হওয়ার কারণে কাউকে বঞ্চিত করা হবে না। শিক্ষকদের মধ্যে যার যেই দক্ষতা রয়েছে তা বর্তমান প্রশাসন কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। তবে যারা স্বৈরাচারের সহায়ক ছিল তাদেরকে সব জায়গায় এক্সেস দেওয়াটা আমাদের জন্য কঠিন হবে।
ইত্তেফাক: আপনি পূর্বে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন দাবি উঠছে। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির বিষয়ে আপনার ভাবনা কি?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যই হল মতামতের ভিন্নতা। ভিন্ন মতামত থাকবে এটাই বাস্তবতা, এটাকে আমরা এড়াতে পারবোনা। কিন্তু এই বাস্তবতা যেন লেজুড়বৃত্তিক হয়ে না যায়। এই বাস্তবতার কারণে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত না হয়। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতামত ও পছন্দ, অপছন্দ থাকতেই পারে। মানুষ হিসেবে এটা তার অধিকার। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যেহেতু একটি পরিবারের মতো সেহেতু প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। এটা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলের জন্য প্রযোজ্য।
ইত্তেফাক: পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে স্টেকহোল্ডারদের নানা জটিলতা তৈরী হয়েছে। এসব জটিলতার কারণ কি বলে মনে করেন?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: একটা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে গেলে সমস্যা যেমন থাকে, তেমনি অনেক সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু প্রধান সমস্যা হল ঐক্য না থাকা। আজকে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি তার পেছনে মূল শক্তি কাজ করেছে ঐক্য। দল, মত নির্বিশেষে সবাই এই বিপ্লবটা সফল করেছে। পরিবর্তনটা আনতে পেরেছে। আমাদেরকে এই সিচুয়েশনে দেশের অন্তর্গত সকল প্রতিষ্ঠানে সবার আগে প্রয়োজন ঐক্য। প্রতিষ্ঠানে বিভাজন তৈরী করলে সেখানে জটিলতা তৈরী হবেই।
ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলোকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসনের সহযোগিতা কেমন থাকবে?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হল সংগঠন। তাই সংগঠনগুলো গতিশীল করতে আমাদের সবরকমের সহযোগিতা থাকবে। এক্ষেত্রে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘে সামঞ্জস্য রেখে আর্থিক বা অন্যান্য সহায়তার প্রক্রিয়াগুলো সহজতর করার চেষ্টা করবো।
ইত্তেফাক: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোন নারী শিক্ষক হিসেবে আপনি প্রশাসনিক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে এসেছেন। সেক্ষেত্রে আপনার নারী সহকর্মী কিংবা নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কোন বার্তা রয়েছে কিনা?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: আমি নারী-পুরুষ আলাদা করতে চাইনা। একজন মানুষের যা প্রয়োজন সেটা যদি পূরণ করতে পারি তাহলে আমাদের নারী-পুরুষ সবার চাহিদাগুলোই পূরণ হবে। আর সবাই যেন সমভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় সেটাই আমার প্রত্যাশা।
ইত্তেফাক: ৪ বছর পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে দেখতে চাই। এটা আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে যেমনটা পূর্বের প্রশাসন প্রত্যাশা করেছে, তেমনটা আমরাও করি। এছাড়াও আমরা সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে যেন উঠতে পারি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কুমিল্লাকে নয় বরং এটি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং বিশ্বে একটি অবস্থান গড়ে তুলবে।
ইত্তেফাক: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেয়ার জন্য। আমার প্রশ্নের বাহিরে আপনি নিজ থেকে কিছু বলতে চান?
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: সহযোগিতা ও ঐক্য এই দুইটি আমার মূল কথা। এগুলো না থাকলে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। যা সকলের জন্যই অমঙ্গল বয়ে আনবে। তাই লক্ষ্য অর্জনে এক হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। এটাই সবার কাছে আমার প্রত্যাশা।
ইত্তেফাক: আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর: দৈনিক ইত্তেফাককেও ধন্যবাদ।