নিয়মানুবর্তিতাই আমলাতন্ত্রের প্রধান দায়িত্ব

অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রশাসন কতটা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করিতে পারিতেছে, তাহা লইয়া ইতিমধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না । এই প্রশাসন কীভাবে চলিবে? প্রশাসন তো প্রশাসনের মতো নাই। স্থবিরতা ও অস্থিরতা লইয়া সরকারি প্রশাসন কী করিয়া সুষ্ঠুভাবে কাজ করিবে? আমাদের দেশে এক সরকার আসিয়া কিছু সংস্কার বা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়, তো আরেক সরকার আসিয়া তাহা আবার সংস্কার করে, এমনকি বহু ক্ষেত্রে আমুল পালটাইয়া দেয়। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষিত না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পড়েন মহাবিপদে৷ তাহারা অনেক সময় হইয়া পড়েন কিংকর্তব্যবিমুঢ়৷ ইহা ছাড়া আমলাতন্ত্রের জন্য যে রুলস-রেগুলেশন রহিয়াছে, তাহা মানিয়া না চলিবার কারণে প্রশাসনে দেখা দেয় একধরনের বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা। তাহাদের জন্য বইয়ে যেসব নিয়মকানুনের কথা লেখা রহিয়াছে, তাহা অনুযায়ী তাহারা দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করিতে পারেন না প্রায়শই। আখেরে ইহাই দেশ ও জাতির জন্য ডাকিয়া আনে সর্বনাশ ও অমঙ্গল ৷

অবশ্য কোনো নিয়ম পরিবর্তন করিতে হইলে তাহার প্রয়োজনীয়তার কথা তাহারা সংশ্লিষ্ট মহলে তুলিয়া ধরিতে পারেন ৷ ইহার নজির যে দেশে নাই, তাহা নহে। ইহার পর যদি সেই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়, তাহা হইলে খুবই ভালো কথা ৷ কিন্তু রুলস অব বিজনেসে যাহা কিছুই লেখা থাকুক না কেন, তাহারা তাহা মানিতে বাধ্য । ইহা মানা হয় না বা ইহার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হয় বলিয়া পরবর্তী সরকার আসিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি তখন তাহাদেরও জেলে যাইতে হয়, রিমান্ডের মুখোমুখি হইতে হয়।

আমাদের দেশে একটি প্রবাদ রহিয়াছে-_'কর্তার ইচ্ছায় কর্ম' । ফলে আমলারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মকানুন লঙ্ঘন করিয়া মন্ত্রী-মিনিস্টারদের ইচ্ছামতো পরিচালিত হন । ইহার মাধ্যমে তাহারা জনপ্রতিনিধের বিপদে ফেলেন, আবার নিজেরাও গভীর বিপদে নিমজ্জিত হন । তাহারা অনেক সময় চাকুরির মায়া বা পরিবার-পরিজনের দিকে তাকাইয়া প্রতিবাদ করেন না বা করিতে পারেন না। কিন্তু তাহাদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলিতে গিয়া পরে দেখেন যে, তাহারা যেই সকল কাজ করিয়াছেন, তাহা আইনবিরুদ্ধ তথা রুলস অব বিজনেসে নাই৷ এইখানে বড় প্রশ্ন হইল, আমলাতন্ত্র কেন সৃষ্টি করা হইয়াছে? একটি রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদরা যাহাতে যাহা খুশি, তাহা করিতে না পারেন সেই চেকস আন্ত ব্যালেঙ্সের জন্য তাহাদের সৃষ্টি । তাহারা রাষ্ট্রের অতন্ত্র প্রহরী এবং ধারাবাহিকতার রক্ষক। কিন্তু তাহারা যখন ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রলোভনের নিকট নতি স্বীকার করিয়া দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেন, তখন তাহারা গোটা সিস্টেমকে দূষিত করেন । আরো দুঃখের বিষয় হইল, এই ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র রাজনীতিবিদরাই সৃষ্টি করিয়াছেন, যাহাতে একটি রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের ছাপ থাকে এবং সকল নাগরিককে সমান চোখে দেখিবার বন্দোবস্ত করা হয়।

বস্তুত আমলাতন্ত্র সৃষ্টির পশ্চাতে যে মহান লক্ষ্য রহিয়াছে, তাহার প্রতি আমাদের সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমরা এই প্রশ্নও রাখিতে চাই, তাহাদের কেন ওএসডি করা হইবে বা এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হইবে? আজ সরকারের কিছু সাবেক কর্মকর্তা যে বিপদে পড়িয়াছেন, তাহা কি তাহাদের কর্তব্যের সীমা সম্পর্কে অসচেতনতা ও অপরিপামদর্শিতার ফল নহে? আমরা কি ভুলিয়া গিয়াছি, সম্প্রতি বিভিন্ন নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন, ডিসি-এসপি এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকজন কী ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করিয়াছেন? এমন কর্মকাণ্ড তাহারা কোন এক্তিয়ারে করিয়াছিলেন? অতএব, নিয়মানুবর্তিতাই সরকারি কর্মকর্তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ৷ এই দায়িত্ব ভুলিয়া গেলে আজ হউক বা কাল হউক এই জন্য তাহাদের মূল্য দিতে হইবে ।