গেল বছর ভারত বিশ্বকাপ চলাকালীন বড় এক অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ জাতীয় দলের এক খেলোয়াড়কে চড় মেরেছেন প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, এমন খবরে গরম হয়ে ওঠে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। পরে বিষয়টিকে মিথ্যা বলে জানিয়েছিলেন সাবেক বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও হাথুরু নিজেই।
এবার সেই চড়কাণ্ড ঘুরেফিরে আবার সামনে এসেছে। এজন্য হাথুরুসিংহকে কারণ দর্শানোর নোটিশের পাশাপাশি প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার জায়গায় জাতীয় দলের নতুন কোচও নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি। এই ঘটনার বাইরে নতুন আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যর্থতাসহ চড়কাণ্ড নিয়ে বিসিবি গেল বছরেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। বিসিবির বর্তমান পরিচালক মাহবুব আনাম ও আকরাম খান সেই কমিটিতে কাজ করেছিলেন। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে চড়কাণ্ডের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিসিবির বর্তমান সভাপতি ফারুক আহমেদ।
গতকাল তিনি বলেছেন, ‘তদন্ত ব্যক্তিগতভাবে করেছি। ভুক্তভোগীর, প্রতক্ষ্যদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছি। সেগুলোর রিপোর্ট আছে। সবকিছু পরিষ্কার করে তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগের তদন্ত রিপোর্টে বিষয়টি উল্লেখ ছিল।’ তবে এই তদন্ত প্রতিবেদনে হাথুরুকে দোষী হিসেবে পাওয়া গেলেও তার অধীনেই গতকাল পর্যন্ত দলের দায়িত্ব ছিল।
চড়কাণ্ড নিয়ে সাবেক সভাপতি পাপন বলেছিলেন, ‘আমি এই ধরনের কোনো কথাই শুনিনি। এক্সসেপ্ট যখন নাকি একটা টিভিতে এটা প্রচার করা হলো। এইখানটায় বলা হয়েছে, আমি জানি। আবার বলা হয়েছে, আমি কোচকে শাসিয়েছি-সামথিং লাইক দ্যাট। আমি জানি এগুলো ডাহা মিথ্যা। এরপরে আর আমার কিছু বলার নেই। জিনিসটা আমি জানি মিথ্যা, এরপরে আর এটি নিয়ে কথা বলব না।’
হাথুরু বলেছিলেন, ‘যারা আমাকে একটু হলেও জানেন, তারা জানেন এরকম কিছু করার মতো মানুষ আমি না। আপনাদের মিডিয়ার মান খুবই নিম্নপর্যায়ের। কী ঘটেছে আমি জানিই না। যারা সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের জিজ্ঞাসা করুন। বুলশিট।’ সে সময়ে ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির প্রধান জালান ইউনুস বলেছিলেন, ‘চড় মারার মতো কিছু ঘটে থাকলে নিশ্চয়ই তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’ গতকাল ফারুক জানালেন, তদন্তে সেটিও বেরিয়েও এসেছিল। তবু বিসিবির পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাথুরু দোষী এমনটি তদন্তে বেরিয়ে আসার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া ব্যথিত হয়েছেন ফারুক। তিনি বলেছেন, ‘আমি দেড় মাস হলো যুক্ত হয়েছি। এর আগে বিষয়টি পত্রিকায় পড়েছি। হালকাভাবে জেনেছি। তখন তো দায়িত্বে ছিলাম না, অসদাচরণের বিষয়টি জানার পর থেকে ভীষণ খারাপ লেগেছে। এরপরে মনে হয়েছে, একটা কিছু হলে ভালো হতো। বর্তমানে আইসিসি কঠিনভাবে বর্ণবাদ কিংবা অসদাচরণের বিষয়টি দেখে। সেখানে যদি আক্রমণের মতো কিছু ঘটে তাহলে তো আরো শক্ত অবস্থানে থাকার কথা। এটা ভুক্তভোগীর জন্য খুব বাজে একটি ব্যাপার।’
বিসিবি সভাপতি আরো বলেছেন, ‘আমরা তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। আমি কাউকে রক্ষা করার জন্য বলছি না। হিট অব দ্য মোমেন্টে (উত্তেজিত অবস্থায়) কিছু জিনিস হতে পারে। কিন্তু শারীরিক আক্রমণ কখনো করা যায় না একটা জাতীয় দলের খেলোয়াড়কে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। এটার শাস্তি ঐ, যেভাবে হচ্ছে। এটাই হওয়া উচিত ছিল আরো আগে।’ তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘রিপোর্ট নিয়ে আমি অনেক কাজ করেছি। এটি নিয়ে ঐ খেলোয়াড়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি, সরাসরি দেখা করেছি। রিপোর্ট আমি পড়েছি, সেখানে সবকিছু আছে। সবকিছু নিয়মের মধ্য থেকে করেছি। প্রক্রিয়াটা করতে একটু সময় লেগেছে। এর মধ্যে পাকিস্তান ও ভারত সিরিজ গেছে।’
ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘আমাদের বর্তমান কোচকে নিয়ে দুই-তিনটা ঘটনা ঘটেছে, যেটি পীড়াদায়ক ছিল আমার জন্য, একজন সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে। সেই সঙ্গে দলের জন্যও খুব একটা ভালো উদাহরণ ছিল না। সেই দিক বিবেচনা করে আমরা তাকে একটা কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি। সেই সঙ্গে প্রধান কোচের দায়িত্ব থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আজকে (গতকাল মঙ্গলবার) সেটি দেওয়া হয়েছে।’ তিনি যোগ করেছেন, ‘এই প্রক্রিয়াগুলো খুব সহজ না। আইনি দিক থাকে এখানে, সঙ্গে অন্য কোচ খুঁজে বের করতে হয়। ফ্রাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের কারণে এখন কম সময়ের জন্য কোচদের পাওয়া যায়, এই বিষয়ে অবশ্য কোচদের দোষ দেওয়া যাবে না। অর্থনৈতিকভাবে তারা খুবই শক্তিশালী। চার মাস কাজ করেই তারা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। এজন্য লম্বা সময়ের জন্য কোনো কোচ কাজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন না। তবু আমরা অন্তর্বর্তীকালীন এক জন কোচের কথা চিন্তা করেছি।’
নতুন কোচ নিয়োগ নিয়ে ফারুক বলেছেন, ‘সামনেই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ আছে। এই সিরিজ থেকে আমরা কোচ নিয়োগ করেছি। এরপরে দুবাইতে হবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে, ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাব পূর্ণ সিরিজ খেলার জন্য, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি রয়েছে। মাসের হিসেবে সাড়ে পাঁচ মাস। এই সময়ের জন্য একজন কোচ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ এ দিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়ার পরে সেটির জবাব দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন হাথুরুসিংহে। তিনি আইনিভাবে লড়াই করবেন বলেও জানিয়েছেন।
এক নজরে বাংলাদেশে দ্বিতীয় মেয়াদে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে
ওয়ানডে
৩৫ ম্যাচ
১৩ জয়
১৯ পরাজয়
৩ ফলহীন
টি-টোয়েন্টি
৩৫ ম্যাচ
১৯ জয়
১৫ পরাজয় ১ ফলহীন
টেস্ট
১০ ম্যাচ
৫ জয়
৫ পরাজয়