সুনামগঞ্জের চলতি নদে ৫ আগস্টের পর ১০০ কোটি টাকার বালু লুট

সুনামগঞ্জের চলতি নদে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বালু লুটের মচ্ছব শুরু হয়েছে। প্রতিদিন শত শত বাল্কহেড ও নৌকা নদে ঢুকে অবাধে বালু উত্তোলন ও পরিবহন করছে। ছোট নৌকা ৩০০ ঘনফুট আর বড় বড় বাল্কহেডে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনফুট বালু পরিবহন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মীদের দাবি, এই নদ থেকে প্রতিদিন ছোট-বড় ৩০০ নৌকায় কমপক্ষে ৫ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট বালুর দাম ৩০ টাকা (বর্তমান বাজারদর) করে হলে মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা এবং গত আড়াই মাসে এখান থেকে ১১২ কোটি টাকার বালু লুট হয়েছে। অথচ এই নদের বালুমহাল ২০১৮ সাল থেকে ইজারা বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে বারবার বলার পরও কোনো ফল না পেয়ে সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (সুপা) একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) সিলেটে গিয়ে বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার আগামী সোমবার সুনামগঞ্জে এসে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানা গেছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ডলুরা সীমান্ত হয়ে ভারত থেকে চলতি নদ এসে শহরতলির সদরগড় এলাকায় সুরমা নদীতে মিশেছে। নদের ডলুরা এলাকায় ৩৭১ একর জমি নিয়ে একটি বালুমহাল রয়েছে। এই মহালের নাম ধোপাজান। একসময় এই নদে খননযন্ত্র (ড্রেজার, বোমা মেশিন) দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে দুই তীরের বহু গ্রাম ও স্থাপনা ভাঙনের কবলে পড়ে। ব্যাপক ক্ষতি হয় প্রকৃতি ও পরিবেশের। এ কারণে ২০১৮ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সিদ্ধান্তে চলতি নদের ধোপাজান বালুমহালের ইজারা বন্ধ করা হয়। এরপর থেকে এটি আর ইজারা হয়নি। তবে নদের তীরবর্তী এলাকার হাজারো শ্রমিক ছোট ছোট নৌকা দিয়ে বালু তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সুনামগঞ্জের চলতি নদ সীমান্ত থেকে এসে সুরমা নদীর যে স্থানে মিশেছে, সেটির নাম সদরগড়। সুরমা থেকে চলতি নদের একেবারে প্রবেশমুখে কয়েকটি বাঁশ পোঁতা। একটি বাঁশে লাল পতাকা টাঙানো। জানা গেছে, প্রশাসন বালু লুট বন্ধে বাঁশের বেড়া দিয়েছিল, যাতে নদের ভেতর বাল্কহেড ও নৌকা না ঢুকতে পারে; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বালুখেকোরা বেড়া দেওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে ফেলে।

বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে সরেজমিনে দেখা যায়, বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। গতকাল বুধবার থেকে কোনো নৌকা নামেনি। অথচ তিন দিন আগে এখানে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে শত শত বাল্কহেড ও নৌকায় বালু নেওয়া হয়েছে।

সদরগড় গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনে ২০০ থেকে ৩০০, আর রাতে অগুনতি নৌকা বালু লুটের কাজে নামত। ৩০০ ঘনফুট থেকে ১০ হাজার ঘনফুট বালু ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্টিলের এসব বড় নৌকা একটানা আড়াই মাস বালু তুলেছে। নদীর তীরে দিনে-রাতে শত শত লোকের ‘মেলা’ বসত। দুই দিন ধরে সবাই নিজেকে একটু আড়াল করেছেন।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, চলতি নদ এখন মাফিয়া চক্রের কবলে। আগে এলাকার সাধারণ বারকি শ্রমিকেরা ছোট ছোট নৌকা দিয়ে বালু তুলে সংসার চালাতেন, এখন ড্রেজারের কারণে হাজার হাজার বারকি শ্রমিক বেকার। লুটেরাদের কারণে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (সুপা) সভাপতি এ কে এম আবু নাছার জানান, নদীতে বালু লুট শুরুর পর নানাভাবে তারা বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে লিখিত দিয়েছেন; কিন্তু কোনো ফল হয়নি।

তবে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান অবশ্য পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, চলতি নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। যারা এসব অবৈধ কাজে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে যদি পুলিশের কেউ জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র: প্রথম আলো