জাতীয় ঐক্য কেন প্রয়োজন

আমেরিকান রেভিলিউশনারি যুদ্ধে জন ডিকিন্সনের একটি বিখ্যাত গান সেই দেশের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছে। সেই গানের গুরুত্বপূর্ণ লাইনটা হইল: 'Then join hand in hand, brave Americans all, By uniting we stand, by dividing we fall.'-(The Liberty Song, 1768)। জাতীয় ঐক্যই হইল যে কোনো দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি; কিন্তু বর্তমানে অনৈক্যই বাংলাদেশের বড় সমস্যা।

বিভেদ, বৈষম্য ও সংকীর্ণ স্বার্থের কারণে আমরা বারংবার জাতি হিসাবে নানানভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইতেছি। বিশেষত দেশ কীভাবে চলিবে বা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হইবে জাতীয় ঐক্য, সেই বিষয়টি আমরা উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছি। বরং একে অপরকে উৎখাত বা মূলোৎপাটনের রাজনীতিই বারবার বড় হইয়া দেখা দেয়। যদিও নির্মূল বা মূলোৎপাটনের কথা বলিয়া থাকেন বামপন্থি বা উগ্রপন্থিরা। লিবারেল ডেমোক্রেসি বা উদার গণতন্ত্রের অভিধানে তাহার কোনো স্থান নাই।


দেশে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জাতিকে প্রস্তুত করিতে হইবে। এই জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় ও দূরদর্শিতাপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ইহার বিকাশ সাধন। উন্নত, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য আমাদের মৌলিক বিষয় ও অগ্রাধিকারগুলি পূর্বে ঠিক করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক নিয়মে আমাদের দেশে সাধারণত পাঁচ বৎসর পরপর সরকার গঠন করা হয়, যদিও এখন সংস্কারপূর্বক সরকারের মেয়াদ চার বৎসর করিবার কথা উঠিয়াছে; কিন্তু আমরা যদি কাহাকেও উৎখাত করিবার চেষ্টা করি, তাহা হইলে তাহার পরিণাম কি কখনো শুভ হইবে? আজ হউক বা কাল হউক তাহারা কখনো ক্ষমতারোহণ করিলে কি জিঘাংসা, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বজায় রাখিবেন না? তখন আমাদের দেশ ও সমাজটা কি আবার উত্তপ্ত কড়াইয়ে পরিণত হইবে না? আমরা এই কথা বলি না যে, অতীতে এমন ক্ষতিকর রাজনীতির কোনো অস্তিত্ব ছিল না; কিন্তু কাউকে না কাউকে এবং কোনো না কোনো এক সময়ে আসিয়া জাতির বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে আমাদের এই ক্ষেত্রে অবশ্যই ফুলস্টপ দিতে হইবে। গড়িয়া তুলিতে হইবে পরমতসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা। নতুবা আমরা সম্মুখের দিকে তথা উন্নতি ও অগ্রগতির পথে যে অগ্রসর হইতে পারিব না তাহা বলাই বাহুল্য।


প্রকৃতপক্ষে যে কোনো দেশে উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে জাতীয় ঐক্যের উপর। এমনকি আজ যাহারা প্রতিপক্ষকে মূলোৎপাটনের কথা বলিতেছেন, দেখা যাইতেছে সেই ব্যাপারেও তাহাদের মধ্যে ঐকমত্য নাই। অথচ ইহা কোনো চাপাইয়া দেওয়ার বিষয় নহে। ইহা ছাড়া যাহারা মূলোৎপাটন করিবেন, তাহাদের এই কাজে দরকার পুলিশ, র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতা। রাজনীতিবিদদের মনে রাখিতে হইবে, তাহাদের শক্তির দৌড় কোন পর্যন্ত, সেই সম্পর্কে জনগণ বেওয়াকিফহাল, এমনটি মনে করিবার কোনো অবকাশ নাই।

ক্ষমতায় থাকিবার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া তাহারা মাঠে নামিয়া কতটা কী করিতে পারেন সেই সম্পর্কে তাহারা কি কখনো আত্মসমালোচনা করিয়া দেখিয়াছেন? তাহা ছাড়া অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলায় দেশে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তাহাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ ব্যাহত হয়। ইহাতে অর্থনীতির গতি শ্লোথ হইয়া পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশিরা বিনিয়োগ করিতে আসিলেও তাহারা আসলে আসিবেন টাকা পাচার করিতে। দীর্ঘকালের জন্য ব্যবসায়-বাণিজ্য করিবার জন্য নহে।

অতএব, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলির আমরা সমাধান করিতে পারি, যেমন- দুর্নীতি ও বৈষম্য দূরীকরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালীকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন, বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নয়ন ইত্যাদি। এই জন্য আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা, রেষারেষি, সন্দেহ-অবিশ্বাস ইত্যাদি দূর করিতে হইবে। রাজনৈতিক সহিংসতাসহ জাতি বিভক্ত হয়-এমন কাজ হইতে সরিয়া আসা এখন খুবই প্রয়োজন।