সহমত জানাও—আখের গোছাও

চিররঞ্জন সরকার

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘মিলিত মৃত্যু’ নামে এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।/ বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।/ বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।/ অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায় অনায়াসে সম্মতি দিও না।/ কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,/ তারা আর কিছুই করে না, তারা আত্মবিনাশের পথ পরিষ্কার করে।’ কিন্তু আমরা এখন দ্বিমত পোষণের রাস্তা ছেড়ে ক্রমেই ‘সহমত ভাই’-এর দলে নাম লেখাচ্ছি। মধ্যবিত্ত বাঙালিরা অবশ্য হুজুগে মাততে পছন্দ করে বেশি। সেই দিক থেকে বলা যায়, এখন চলছে ‘সহমত ভাই’ হুজুগ। অনেকে এমন কথাও বলছেন যে, এখন হলো ‘সহমত ভাই’-এর যুগ। সবাই সবকিছুতে একমত হয়ে যান। ভিন্নমত জানানো মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে।

আপনি কিছু একটা লিখলেন, যেখানে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ আছে। কিন্তু ভিন্নমত কেউ পোষণ করবে না বললেই চলে। যেহেতু আপনি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ভিন্নমত পোষণ করলে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে তাদের বাদ দিতে পারেন, তাই তারা ঝুঁকি নিতে রাজি হয় না। মনে মনে দ্বিমত থাকলেও অকাতরে মন্তব্য করে বসবে, ‘সহমত ভাই’।

এখন ‘সহমত ভাই’ নিয়ে রীতিমতো কবিতা, ছড়া, গল্প, ব্লগ, ফেসবুক পেজসহ নানা কিছু হচ্ছে। এক ছড়াকার লিখেছেন—‘সূর্য এখন পশ্চিমে ওঠে, অস্ত যাচ্ছে পূর্বে’/ চামচারা কয়, ‘ভাইয়া যেমন বলবে তেমনই ঘুরবে!’/ ‘একপাল গাধা চামচা পেয়েছি, ওপরওয়ালার রহমত’,/ নেতার কথায় সায় দিয়ে কয় চামচারা, ‘ভাই, সহমত!’

‘সহমত ভাই’ এখন খুব জনপ্রিয় এক ‘উপহাস-বাক্যে’ পরিণত হয়েছে। ফেসবুকে এখন ‘সহমত ভাই’য়েরই জয়জয়কার। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে বিনা শর্তে কারও কথা মেনে নেওয়া বোঝাতে এটি ব্যবহার করছেন অনেকে। আবার ট্রল করতেও ব্যবহার করা হচ্ছে কথাটি। আছে পেজও। যেগুলোর ‘ডেসক্রিপশন’ (বর্ণনা)-এর জায়গায় লেখা ‘সহমত ভাই সবচেয়ে পাওয়ারফুল নেতা’। এগুলোর পোস্টও ব্যঙ্গাত্মক। একটি পোস্টে দেখা যায় ফিলিং স্টেশনের ছবি। এক ব্যক্তি বলছেন, ‘তেল দে তো...’। অপর ব্যক্তির উত্তর, ‘সহমত ভাই...রাজপথ ছাড়ি নাই, আপনার আদর্শ ভুলি নাই...’। আগের ব্যক্তি বলছেন, ‘আরে ভাই আমারে না, বাইকে তেল দে...’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের দেওয়ালে সম্প্রতি ‘সহমত ভাই’ শীর্ষক একটি গ্রাফিতি আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে প্রজ্বলিত বাতির ওপর লেখা আছে ‘শিক্ষাই আলো’। তার নিচে এক পাশে আছে শাপলা ফুল, অন্য পাশে বাংলা স্বরবর্ণের ‘অ’। মূল লোগোর নিচের স্তরে লেখা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। গ্রাফিতিতে ‘শিক্ষাই আলো’র জায়গায় লেখা হয় ‘সহমত’। নিচের শাপলা ফুল আর ‘অ’ বর্ণের জায়গায় লেখা হয় ‘ভাই’। নিচের স্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় লেখা হয় ‘মেশিন’। ফেসবুকে ওই গ্রাফিতির ছবি পোস্ট করে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিচ্ছবি এটি।’

আসলে ‘সহমত ভাই’ এখন কেবল বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যই নয়, আমাদের সমাজেরই স্থিরচিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে এখন তোষামোদির চর্চা বেড়ে গেছে। কারও মনোরঞ্জন বা দৃষ্টি আকর্ষণ কিংবা কমিটিতে একটি পদ পাওয়ার জন্য তোষামোদ করা হয়। তোষামোদির চর্চা করতে করতে এখন এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিই হয়ে গেছে। মত এখন একটাই—তা হলো সহমত!

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। এই শ্রেণি বৈষয়িক অর্জনের জন্য বেপরোয়া। তারা সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে যোগ্যতা-মেধা-অধ্যবসায় নয়, চাটুকারিতা ও তোষামোদিকেই ব্যবহার করছেন। কারণ তারা দেখছেন, এদেশে তোয়াজ-তোষামোদ আর চাটুকারিতা দিয়ে সবাই ওপরে উঠছেন, পদ-পদবি-সুবিধা বাগাচ্ছেন। নেতা হচ্ছেন। ব্যবসায়ী হচ্ছেন। টাকা কামাইয়ের নানা সুযোগ পাচ্ছেন। আর সুযোগ পেয়ে তারা কেবলই কর্তা-ভজা কীর্তন গাইছেন। যে ওপরে আছে, তার প্রশংসা করছেন। তার অপকর্মেও সায় দিচ্ছেন। এতে করে অপকর্মকারী পেয়ে যাচ্ছেন সমর্থন ও সমর্থক। আর যে সমর্থন করছে, সে পেয়ে যাচ্ছে কিছু ‘প্রসাদ’। ‘প্রসাদ’ পেয়ে ভক্ত ধন্য। আর প্রশংসা ও পূজা পেয়ে দেবতা ধন্য।

তাছাড়া দ্বিমত পোষণের অনেক ঝামেলা আছে। পদে পদে ঝামেলায় পড়তে হয়। দ্বিমত পোষণকারীকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়। ঝামেলাবাজ, ঘাড়ত্যাড়া হিসেবে বিবেচনা করে তাকে হল-দল-প্রতিষ্ঠান-পদ-পদবি থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এখন ‘ভালো’ মানে যে খুব ‘অনুগত’, কথা ‘শোনে’। জীবন দিতে ও নিতে পিছপা হয় না। তাই তো তরুণরা টিকে থাকার, ওপরে ওঠার আদর্শ হিসেবে ‘সহমত ভাই’ হয়ে যাচ্ছেন দিনে দিনে।

পরিশেষে আহমাদ ইকরাম আনামের লেখা ‘আমরা ছিলাম সহমত ভাই’ শীর্ষক একটি গল্প!

পাশাপাশি দুটি কবর। শুয়ে আছেন দুজন। মুনকার-নাকির ফেরেশতাদ্বয়ের প্রশ্ন শেষ হয়েছে কি না, আমরা জানি না। কবরে শায়িত দুজন কথা বলছেন পরস্পর।

একজন আরেকজনকে।

—ভাই, আপনাকে দেখে তো সাচ্চা আদমি মনে হচ্ছে। মন খারাপ করে শুয়ে আছেন কেন? আযাব নিয়ে খুব বেশি টেনশন হচ্ছে?

— না, ঠিক তা না। একটা বিষয় নিয়ে অস্বস্তি লাগছে। খুঁতখুঁত করছে মন।

— কী বিষয়? আচ্ছা, আপনি করতেনটা কী?

— আমি কর বিভাগের একজন কর্মকর্তা ছিলাম...

এটুকু শুনে পাশেরজন খানিকটা নড়েচড়ে উঠলেন। ওয়েল, জীবিত থাকলে হয়তো নড়েচড়ে বসতেন; মৃত হওয়ায় নড়েচড়ে বসার পরিবর্তে যা করা সম্ভব, তাই করলেন।

কর কর্মকর্তা কবরবাসী কথা বলে চলেছেন: জীবনে ভীষণ সত্ ছিলাম। এক পয়সাও ঘুষ খাই নাই কোনো দিন। বড়ো বড়ো কর ফাঁকিবাজদের ধরেছি। রাজনৈতিক শক্তির কাছে নতি স্বীকার করিনি। অসত্ সহকর্মীদের কূটচাল থেকে অনেক সংগ্রাম করে বেঁচে চলেছি। জীবনটা ছিল আমার জন্য একটা লড়াই। উচ্চমহল অনেকবার আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, ফাঁসাতে চেয়েছে। পারেনি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি ছিলাম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবুও...

— তবুও কী, ভাই? আপনি তো চ্যালচ্যালায়া বেহেশতে যাবেন!

— তবুও আল্লাহর কাছে একটা প্রশ্নের আমি কী জবাব দেব, তা নিয়ে ভাবছি।

— কোন প্রশ্ন সেটা?

— এই যে রাঘব বোয়াল থেকে শুরু করে একেবারে খেটে খাওয়া মানুষের কর নিখুঁতভাবে রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করেছি; আমার হাতে পড়লে কেউ প্রকৃত আয় লুকিয়ে কৌশলে এক পয়সাও ফাঁকি দিতে পারেনি, কিন্তু...

— আরে ভাই, ঝেড়ে কাশেন। এত কিন্তু কিন্তু করেন কেন? যেহেতু ইতিমধ্যে মরে গেছি; বলতেও তো পারছি না যে উত্তেজনায় মরে যাচ্ছি। আপনার মতো লোকের এত দুশ্চিন্তা কীসের? দুশ্চিন্তা তো করবে আমার মতো মানুষ।

— কিন্তু আমি যে এত নিষ্ঠার সঙ্গে, সততার সঙ্গে পাই-পয়সা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করলাম, এই পয়সা খরচের সময় কি তা নিষ্ঠার সঙ্গে করা হয়েছে? পরিচিত লোককে ঠিকাদারি দিয়ে পয়সা লুট করা হয়নি তো? কম দামি জিনিসের দাম অনেক বেশি দেখিয়ে টাকা আত্মসাত্ করা হয়নি তো? গরিবের করের টাকা ধনকুবেরের সুবিধা প্রদানের কাজে লাগানো হয়নি তো? ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে পাচার করা হয়নি তো এই টাকা, সুইস ব্যাংক কিংবা এমন কোথাও? অথবা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করা হয়নি তো প্রকল্প কর্মকর্তার গাড়ির তেলের পেছনে?

অন্যজন চুপ। তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে। জীবিত থাকলে এতক্ষণে হয়তো তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমত। আর কবরের ভেতরে এমনিতেও তো অনেক গরম।

কর কর্তাই নীরবতা ভাঙলেন। বললেন, তাহলে বোঝেন অবস্থা। আল্লাহ যদি প্রশ্ন করেন: তুমি যে তলাবিহীন ঝুড়ি পূরণ করার এত চেষ্টা করলা, তাতে কী হলো শেষ পর্যন্ত; আমি কী জবাব দেব?

অপরজন চুপ। অন্ধকার কবরেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার অস্বস্তি। কর কর্তা হড়বড় করে অনেক বলেটলে একটু হালকা বোধ করছেন। অন্যজনের অস্বস্তি তার দৃষ্টি এড়ায়নি। জিজ্ঞেস করলেন, তা আপনি তো স্বাভাবিকই ছিলেন। হঠাত্ ঘাবড়ে গেলেন মনে হচ্ছে। কী ব্যাপার? আর একটু আগে বলছিলেন যে দুশ্চিন্তা করা উচিত আপনার মতো লোকের। কিন্তু কেন? ওহ, আপনার পরিচয়ই তো জানা হয়নি। কী করতেন আপনি?

— আমি ছিলাম একজন ‘সহমত ভাই’, উত্তরে বললেন অপরজন।

কবরের নিস্তব্ধতা যেন আরেকটু ভারী হয়ে উঠল!

n লেখক : রম্যরচয়িতা