মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
বাংলার জনপদে প্রায়ই একটি বচন মুখে মুখে শোনা যায়। তাহলো ‘মুড়ি আর ভুঁড়ি ভালো তো সব ভালো’। অবশ্য ছোটোবেলায় অনেকবার শুনেছি, সে সময়ে অতটা বুঝিনি এবং গায়েও অতটা মাখেনি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে মনোদৈহিক সমস্যার আবর্তে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। এবার আসুন, মুড়ি ও ভুঁড়ি বলতে কী বুঝি? এক্ষেত্রে আভিধানিক অর্থে মুড়ি হলো—মাথা এবং ভুঁড়ি বলতে পেট বা পাকস্থলী বোঝানো হয়েছে। চিকিত্সাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে একটি বিস্ময়কর সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে মাথা হলো প্রথম মস্তিষ্ক এবং দ্বিতীয় মস্তিষ্ক হলো পাকস্থলী বা পেট। আমাদের মাথার খুলির মধ্যে প্রথম মস্তিষ্কের কোষ হিসেবে শতাধিক বিলিয়ন নিউরন (Neuron) বিদ্যমান, যা সদা তড়িত্ সংকেতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকল অঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যস্ত। এদিকে দ্বিতীয় মস্তিষ্ক হিসেবে আমাদের পাকস্থলীতে আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র (Enteric Nervous System), বিশেষ করে খাদ্যনালি থেকে শুরু করে পায়ুপথ পর্যন্ত সমুদয় পরিপাক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এক্ষেত্রে প্রায় ১০০ মিলিয়ন নিউরন বা স্নায়ুকোষ অনবদ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এখানে নিউরনের সংখ্যা কম নয়, যা একটি ইতর প্রাণী, উদাহরণস্বরূপ একটি বিড়ালের মাথার সমান।
আমাদের প্রথম মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে ভেগাস স্নায়ুর মাধ্যমে দেহের নানা অঙ্গের আওতায় স্বরযন্ত্র, হূিপণ্ড, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র, ইত্যাদির সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, আমরা যা ভাবি বা করি তা আমাদের মনের সারথি ধরে চলে থাকে। আর মন হলো প্রথম মস্তিষ্কের কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সেহেতু প্রথম মস্তিষ্ক এই ভেগাস স্নায়ুর মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক অবস্থার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের প্রতিভূ হিসেবে আমরা কি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হব, নাকি নিজেকে রক্ষা করতে পালিয়ে যাব সে ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আর কোনো ভয়াতুর পরিশেষে যে উপসর্গ সৃষ্টি হয়; তা হলো বাড়তি হূত্স্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, পেটে মোচড়, পেটডাকা, চাপা কষ্ট ইত্যাদি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, অধুনা গবেষণায় দেখা গেছে, মাথা আলাদা করার পরও পাকস্থলী (অন্ত্র) স্বয়ংক্রিয়ভাবে অল্প কিছু সময় কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। অবশ্য এর পেছনে কারণ হলো দ্বিতীয় মাথা হিসেবে পেটের নিজস্ব স্নায়ুতন্ত্র, যা প্রায় ১০০ মিলিয়ন নিউরন দ্বারা সুসংগঠিত। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিপাক-সম্পর্কিত সকল প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় প্রথম মস্তিষ্ক দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও সামান্য কিছুক্ষণ দ্বিতীয় মস্তিষ্ক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। প্রথম মস্তিষ্কস্থ বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরনের মাধ্যমে চেতন ও অবচেতন মনের আওতায় আমরা যোগাযোগ ও সংবাদ আদান-প্রদান করছি। এটিই প্রকারান্তরে আমি বা আমরা বললে এতটুকু ভুল হবে না। এদিকে আমরা সাধারণ মানুষ ভাবি যে, মন হলো বুকের অভ্যন্তরে হূদয়ে। আসলে তা নয়, মন হলো প্রথম মস্তিষ্ক হিসেবে মাথায়।
দ্বিতীয় মস্তিষ্কটি পরিপাকনালিতে ক্রিয়ারত স্নায়ুকোষ এবং অসংখ্য মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সুসংগঠিত। এ স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়া-প্রক্রিয়া কেবল উদ্ভূত পেটব্যথা বা হজমের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র হলো স্নায়ুকোষ দ্বারা গঠিত এবং জালের সদৃশ্য নেটওয়ার্ক, যা সমগ্র পরিপাকনালির গা জুড়ে অবস্থান নিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে পেটব্যথা বা মোচড় দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো এই স্নায়ুতন্ত্রেরই অমোঘ কারসাজি। উল্লেখ্য যে, পেটের প্রায় ৯০ শতাংশ স্নায়ুকোষই ভেগাস স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি প্রথম মস্তিষ্কে তথ্য প্রেরণ করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় এই দ্বিতীয় মস্তিষ্ক তথা আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র আমাদের মানসিকতার ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শুধু তা-ই নয়, পরিপাকনালির অভ্যন্তরে আন্ত্রিক স্নায়ুতন্ত্র মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়াদেরও সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। আর অন্ত্রে অবস্থানরত এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্বারাই আমাদের আন্ত্রিক মাইক্রোবায়োম (অণুজীবদের সমষ্টি) গঠিত, যা আমাদের দেহের জন্য অপরিহার্য। আর আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই ব্যাকটেরিয়া সংখ্যায় সমগ্র মানবদেহের কোষসংখ্যার প্রায় সমপরিমাণ।
বর্তমানে স্থূলতা মনুষ্যদেহে বলতে গেলে মহামারি হিসেবে, বিশেষ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইংরেজিতে একটি প্রবচন কমবেশি সবারই জানা; যা হলো—‘Fatty body depots of all diseases.’ এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওষুধ সেবন কিংবা অস্ত্রোপচার করলে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক সময় আরো বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই বৈজ্ঞানিকরা এমন একটি নির্ভরশীল ডিভাইস আবিষ্কার করেছেন, যা আমাদের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে স্থূলতাপ্রসূত অতিরিক্ত ওজন এক বছরের মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগ কমানো সম্ভব। এতদ্ব্যতীত জটিল রোগ বিশেষ করে পারকিনসন্স, রিওম্যাটিক আর্থ্রাইটিস, ইত্যাদি নিরাময়ের ক্ষেত্রে প্রথম মস্তিষ্ক ছাড়াও দ্বিতীয় মস্তিষ্ক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করলে আরো সুফল পাওয়া যাবে বলে মনোরোগ চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশের সূত্র ধরে মানবের মাঝে জিন ও ব্যাকটেরিয়া আদান-প্রদানের হার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এজন্য গবেষকরা বিশ্বাস করেন, স্বাস্থ্যকর মাইক্রোবায়োম সুস্থ ও গঠনমূলক সামাজিক আচরণ গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারে। অতএব, অদূর ভবিষ্যতে প্রথম মস্তিষ্কের পাশাপাশি দ্বিতীয় মস্তিষ্কও সর্বক্ষেত্রে পাবে কনকময় আসন।
n লেখক : গবেষক