‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মান মন্দির’ নিয়ে কিছু কথা

ড. উত্তম কুমার মজুমদার

সারা বিশ্বের সকল জাতির মতো মহাকাশ নিয়ে বাঙালি জাতির অনুসন্ধিত্সা দীর্ঘকালের। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,

     ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?

     তারই রথ নিত্যই উধাও; জাগাইছে অন্তরীক্ষে হূদয়স্পন্দন।’

মহাকালের মহাকাশ তাই চির বিস্ময়ের! সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানমতে, ১৩৮০ কোটি বছর (প্রায়) আগে মহাবিশ্বের জন্ম হয়ে থাকলেও আমাদের প্রাণপ্রিয় পৃথিবীর বর্তমান বয়স মাত্র ৪৫৪ কোটি বছর (প্রায়)। গত ২৮ জুনের দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি আমাদের মুগ্ধ করেছে। ভৌগোলিকভাবে অতিগুরুত্বপূর্ণ ১২টি সংযোগবিন্দুর মধ্যস্থল ভাগের একমাত্র প্রাণ পাওয়া যোগ্যবিন্দুটি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার ফসলি জমিতে অবস্থিত; সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জেনে আমরা আনন্দে উদ্বেলিত। ভূ-প্রাকৃতিক সুন্দর অবস্থান (উত্তর গোলার্ধে কর্কট ক্রান্তিরেখা অতিক্রমকারী দেশ) হওয়ার কারণেও ঋতু পরিবর্তনের (আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন) সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে গিয়ে বাঙালি জাতি সুদূর অতীতকাল থেকে বায়ুপ্রবাহ তথা আকাশমণ্ডলের শুধুমাত্র তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই করেনি, বরঞ্চ প্রতিমুহূর্তের অনুষঙ্গ হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে ছন্দাকাওে বেঁধে রেখেছে। মহাকাশবিজ্ঞানী খনার বচন (খনার বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত) রাডারের মতো এ জাতিকে চলবার সতর্ক ইঙ্গিত দিয়েছে, সুখে থাকবার প্রেরণা দিয়েছে। যেমন: ‘জ্যৈষ্ঠে খরা আষাঢ়ে ভরা,/ শস্যের ভার সহে না ধরা।’ ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।’ ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত/তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’ ইত্যাদি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাঙালির নিত্য সঙ্গী হওয়ায় সর্বদা তা প্রতিরোধে এ জাতি স্বাবলম্বী। দীর্ঘদেহী সবল কাঠামো, মানসিক দৃঢ়তা, বাস্তব জ্ঞান ও মেধাযুক্ত প্রখর বুদ্ধিমত্তা তাই অতীতকাল থেকেই তাকে এনে দিয়েছে গৌরবের মর্যাদা। সুদূর অতীতে এ জাতি ঘরে বসে থাকেনি, বাণিজ্য করেছে। তার উন্নত অস্ত্রসজ্জিত রণতরী ও সুবিশাল বাণিজ্যতরী যখন বিশ্বের খ্যাতনামা বন্দরগুলোতে ভিড়ত, তখন বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত দৃষ্টিনন্দন ও উত্কর্ষে সেরা এদেশি পণ্যের জন্য।

বাঙালি ভাবুক জাতি, প্রেমিক জাতি। অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী এ জাতির প্রেম ছিল সারা বিশ্বের সকলকে নিয়ে (‘একাকী নয় জগত্ লয়ে, চল রে আনন্দ হয়ে; আমার দেহের পরমাণু বলে নিলাম আমি জগতের ভার।’—কালীকচ্ছ, সরাইল নিবাসী সর্বধর্মাবতার আনন্দ স্বামিজী)। তাই বাঙালির বাউল মন তাকে চিন্তাচেতনায় করেছে মানবিক; বৈষয়িক চিন্তাকে এতোটা প্রাধান্য না দিয়ে আত্মিক শান্তি সে খুঁজতে চেয়েছে—বিলিয়ে দিতে চেয়েছে বিশ্বের সকলের মাঝে নির্মল আনন্দ। বাঙালি তার ভালোটা উজাড় করে দিতে কখনোই কার্পণ্য করেনি, চলার পথে তাই জাগতিক আবেগ ছেড়ে বিবেকী হতে পেরেছে। আর এ সুযোগটাই বিদেশি বেনিয়ারা নিয়েছিল, আমাদের ভালোমানুষীর সুযোগগুলোকে হীনস্বার্থে ব্যবহার করে আমাদেরকে দাসত্বের শৃঙ্খলে জড়িয়েছিল। কিন্তু বাঙালি বীরের জাতি; সশস্র সংগ্রামে বিজয় গৌরব ফিরে পেয়েছে।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের গবেষণালব্ধ নিবন্ধে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির’ নির্মাণের জন্য যে স্থান চিহ্নিত করেছেন; তার সন্নিকটেই টুঙ্গীপাড়ার অবস্থান—যা বাঙালি জাতির প্রেরণার উত্স। এ স্থানে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মানমন্দির স্থাপিত হলে তা বিশ্বের অন্যান্য স্বনামধন্য মানমন্দিরের তুলনায় ত্রুটিহীন তথ্য প্রদানে অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তাছাড়া সারা বিশ্বের মানুষের কাছে স্থানটি একটি অতীব আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটের মর্যাদাও পেতে পারে।

কুমিল্লা