মানি লন্ডারিং মামলার কার্যকর তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামি বা সাক্ষীর পরিচয় নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করতে হবে। এই লক্ষ্যে ইসির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) সংক্রান্ত মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে ‘ফলো/ট্রেইল দ্য মানি’ একটি কার্যকর তদন্ত পদ্ধতি। অর্থের গন্তব্যের বিষয়ে তদন্ত করলেই এবং গন্তব্য খুঁজে পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধীর খোঁজ পাওয়া যায়। এ কারণে একটি দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান বা মামলার তদন্তকালে অর্থের ‘ফলো চার্ট’ তৈরি এবং ‘ফিন্যান্সিয়াল ট্রান্সজেকশন প্রোফাইল’ তৈরি ও প্রমাণের জন্য ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই অপরাধলব্ধ অর্থ বা সম্পদের গতিবিধি অনুসরণ করে মূল অপরাধী শনাক্ত করা এবং অপরাধলব্ধ সম্পদ উদ্ধারের লক্ষ্যে এবং ‘ট্রেইল দ্য মানি’ কার্যকর করার জন্য দুদকে একটি ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অনুসন্ধানকারী বা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সহযোগিতার জন্য টিম গঠন এবং একজন ফরেনসিক অ্যাকাউন্টকে টিমের সদস্য করে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। এ জন্য কমিশনকে আরো লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে।
জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের মিরপুরের ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ৩৩টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ২৬ মামলায় পাটকলের শ্রমিক নিরপরাধ জাহালমকে মূল অপরাধী আবু সালেক হিসেবে চিহ্নিত করে আসামি করা হয়। তিন বছর কারাভোগ করেন তিনি। হাইকোর্টের নির্দেশে এ ঘটনায় কারা জড়িত সে বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। দুদকের পরিচালক (লিগ্যাল) আবুল হাসনাত মো. আব্দুল ওয়াদুদ এই প্রতিবেদন দেন। মঙ্গলবার প্রতিবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান।
সুপারিশসমূহ :একই ঘটনা থেকে একাধিক মামলা নয়
প্রায় ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা থেকে ৩৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে অহেতুক জটিলতা। এখানে মূল ঘটনাস্থল একটি। আর সেটা হচ্ছে মিরপুরের ক্যান্টনমেন্টের সোনালী ব্যাংক শাখা। এখান থেকেই মূলত টাকাগুলো আত্মসাত্ হয়েছে। উত্তোলন হয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন স্থান থেকে। সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখকে অপরাধ সংঘটনের স্থান হিসেবে বিবেচনা করলে মামলা একটিই হওয়া উচিত। একটি মামলা হলে আইনগত কোনো অসুবিধা হতো না, বরং তদন্তে সুবিধা হতো। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
কেস ডায়েরি যথাযথভাবে লিখতে হবে
অনুসন্ধান বা তদন্তকাজের মান নিশ্চিতের লক্ষ্যে যথাযথভাবে অনুসন্ধান নোটবই বা কেস ডায়েরি লিখন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ডায়েরিতে তদারককারী কর্মকর্তার পরামর্শের প্রতিফলন থাকতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ভুলভাবে আসামিভুক্ত হলে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তদারককারী কর্মকর্তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ভাড়ায় সাজা খাটার ঘটনা বিরল নয়
জাহালম ঘটনার তদন্তকালে দুদকের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একটি পত্র পাই। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে জাহালম টাকার বিনিময়ে আবু সালেক সেজে জেল খাটবে এবং এর বিনিময়ে সে অর্থপ্রাপ্ত হবে। এর সঙ্গে দুদকের দুজন কর্মকর্তা ও ব্র্যাক ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জড়িত। আমাদের দেশে একজন আসামির পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির ভাড়ায় সাজা খাটার ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু বিষয়টি তদন্ত করে উদ্ঘাটন করতে হলে যে ব্যাপক তদন্তের প্রয়োজন হয়, তা এই তদন্ত কমিটির পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়টির তদন্ত করে সত্যতা নিরূপণের জন্য মামলাগুলোর অধিকতর তদন্তের জন্য নিয়োজিত তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।
প্রসঙ্গত, দুদকের দায়সারা তদন্তে জাহালম ২৬ মামলার আসামি হন। জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যে ভুল হয়েছে, তা দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কারণেই ঘটেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং অ্যাকাউন্টের ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয়দানকারীরা।