জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে অপরাধমূলক কাজে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। মূলত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেয়ায় এই প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অস্ত্রের মহড়া, মাদক ও ছিনতাইয়ে বারবার জড়িয়ে পড়ছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। গত নয় মাসে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে ছয় দফা সংঘর্ষে জড়িয়েছে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে তিনটি সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করে। এতে চাপাতি, রামদা, রড, পাইপসহ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।
গত বছরের দুই অক্টোবর ইভটিজিংকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে মীর মশাররফ হোসেন হল ও আল বেরুনী হলের নেতাকর্মীরা। এই সংঘর্ষে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। তবে অদৃশ্য চাপে এই ঘটনার জন্য তদন্ত কমিটিও গঠন করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ বাণিজ্যের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে চড়-থাপ্পড়ের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শহীদ সালাম বরকত হলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এই সংঘর্ষেও ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়ার শব্দ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এখনো কাউকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এই তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক রাশেদা আখতার বলেন, ‘প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে জমা দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ সর্বশেষ তিন জুলাই ধাক্কাধাক্কির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু হল ও মওলানা ভাসানী হলের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ায়। এতে অন্তত ১২ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। এ ঘটনায় অধ্যাপক রাশেদা আখতারকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে এই তিনটি বড় সংঘর্ষের কোনোটিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেনি শাখা ছাত্রলীগ। ফলে বাধ্য হয়ে গত ৬ জুলাই তদন্ত কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুটি ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলেও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তাতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এদিকে ২৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিং পুল এলাকায় এক ছাত্রীকে লাঞ্ছনা ও সাংবাদিক মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে সাতজনকে বহিষ্কার করে। পরে শাখা ছাত্রলীগের চাপে তিনজনকে বাদ দিয়ে চারজনের বহিষ্কারাদেশ জারি করে প্রশাসন।
এ বিষয়ে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘আমরা খবর পেলেই ব্যবস্থা নেই। তবে এ বিষয়ে প্রত্যেক হলের প্রভোস্টের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।’ এছাড়াও মাদক গ্রহণ থেকে শুরু করে মাদক কারবারির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে নেতাকর্মীরা। শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কয়েক নেতার সঙ্গে মাদক কারবারির যোগসূত্র আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শাখা ছাত্রলীগের এক সম্পাদক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী জহির নিয়মিত শহীদ সালাম বরকত হলে আসতেন। আমি তাকে হলে আসতে নিষেধ করেছি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সেই সহ-সভাপতি আমাকে রুমে ডেকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।’
সার্বিক বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তদন্ত কমিটি করেছে। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করছি। আর মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সর্বদাই সোচ্চার।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। সেগুলো আলাদা একটি সিন্ডিকেট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া বহিষ্কৃতরা হলে থাকার খবর পেলে আমরা হল প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।’