‘শ্রমিকের ঘাম, আকাশে মিশে যায়’— গাজীপুরে নাটকে উঠে এলো নীরব কষ্টের কাব্য

ছোট্ট ঘরে বসবাস, ঘরে নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, রান্নাঘরে গ্যাস আসে না ঠিকমতো। সাথে একজন প্রতিবন্ধী সন্তান, যার পরিচর্যায় মায়ের ধৈর্যের পরীক্ষা চলে প্রতিনিয়ত। এমনই এক অসহায় মায়ের নাম জুলেখা, যিনি প্রতিদিন নিজেকে হারিয়ে ফেলেন নতুন উদ্যমে। শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় পয়সার জন্য তাকে ঘরের বাইরে পা রাখতে হয়, আর মুখোমুখি হতে হয় অসংখ্য ইভটিজিং, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। এইসব কষ্টই উঠে এলো ‘জুলেখার জীবন’ নাটকে, যা গাজীপুরে আয়োজিত এক নাট্য প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়। ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোগে পরিচালিত ‘আমিও জিততে চাই’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে নাটকটি প্রদর্শিত হয়।

প্রদর্শনীতে প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক উপভোগ করলেন তাদেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেনো কেউ তাদের জন্য নীরব কান্নার গল্প লিখে দিয়েছে। নাটকের প্রতিটি মুহূর্তে যেনো শ্রমিকদের জীবনের কষ্ট ফুটে উঠল, সমাজের প্রতি তাদের ক্ষোভ যেন গর্জে উঠল এক নীরব আক্রোশের সুরে। তাদের জীবন কেবল দৈন্যদশায় ভরা নয়, বরং তা হলো বাস্তবের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি, যা দেশের প্রায় অর্ধেক শ্রমিক প্রতিদিন নিজের শরীরের ঘাম দিয়ে গড়ে তোলে। কিন্তু তার বিনিময়ে কী পায়? এক নিরাশার জীবন।

গাজীপুরের কর্মী করিমের মতো অনেকেই বলেন, “নাটকের গল্পের সাথে আমাদের জীবনের গল্প যেনো মিলে যায়।” করিম জানালেন, প্রতিদিন সকালেই পানি না থাকার সমস্যা নিয়ে তাকে ভুগতে হয়। গ্যাসের সমস্যাও লেগেই থাকে, আর এ সকল অসুবিধার মধ্যে যাত্রাপথে হতে হয় নানা রকম হয়রানির শিকার। গার্মেন্টস শ্রমিক সুলতানা যেন ক্ষোভে ফেটে পড়েন, রিকশায় গেলে দ্বিগুণ ভাড়া, বাসে উঠলে শরীরের উপরে পুরুষদের ঘৃণ্য স্পর্শ, আবার ফুটপাথে হাঁটলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। শ্রমিক বলে আমাদের মূল্য কিছুই নেই।

বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ৯৪% নারী পাবলিক পরিবহনে চলাচলের সময় কোনো না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হন। যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং দুর্ব্যবহারের মতো ঘটনাও সাধারণ বিষয়, যা কর্মজীবী নারীদের যাতায়াত আরও কঠিন করে তোলে। নারীরা প্রায়শই এ ধরনের হয়রানির ভয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বা নির্দিষ্ট সঙ্গী নিয়ে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন, যা তাদের স্বাধীন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে। বিশেষত কম আয়ের নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, যাদের বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। তারা যে মানবেতর জীবন যাপন করেন, তা কেবল তাদেরই সহ্য করতে হয়। তাদের জীবনের গল্প সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মতো নয়—যেখানে বেঁচে থাকার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু বদলে একটু স্বস্তি মেলে না।

কিন্তু এইসব মর্মন্তুদ কাহিনী শুধুমাত্র গাজীপুরের শ্রমিকদের জন্য নয়, বরং এই অবস্থা যেন গোটা দেশের গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের এক অমোঘ নিয়তি। তাদের জীবনে হাসি যেন নিষ্প্রাণ, তাদের চোখে সাফল্যের স্বপ্ন নয়, বরং জীবনযুদ্ধের এক দীর্ঘশ্বাস। রাবেয়া নামের এক কর্মী বললেন, “প্রতিদিন বাসে গেলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বাড়ি ফিরতে ভয় হয়, ছিনতাইকারীদের ভয়।” তার এই কথায় উঠে আসে সমাজের নীরব অসহিষ্ণুতা।

ফাতেমার মতো মায়েদের দুঃখের কথা শুনলে বোঝা যায়, তাদের জীবন কেমন কষ্টময়। “বাচ্চাকে একা রেখে কাজ করতে আসি, কিন্তু পুরো সময়টা মনে হয় যেন কেমন করে দিন কাটাচ্ছে। অফিসে বাচ্চা রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই, জরুরি প্রয়োজনে ছুটিও পাওয়া যায় না।” ফাতেমা যেনো এক জননীর প্রতিচ্ছবি, যিনি সমাজের বুকে বেঁচে আছেন বঞ্চনার এক গল্প নিয়ে। বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ারের সুবিধা খুবই সীমিত। দেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে মোট ডে-কেয়ার কেন্দ্রের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বর্তমানে মাত্র ১১৯টি সরকারি ডে-কেয়ার কেন্দ্র রয়েছে, যার বেশিরভাগই ঢাকা শহরে অবস্থিত। দেশের বেশিরভাগ জেলায়, বিশেষ করে ৩৬টি জেলায়, কোনো ডে-কেয়ার কেন্দ্রই নেই, যা কর্মজীবী নারীদের জন্য বিশাল এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এই সীমাবদ্ধতা থেকে অনেক নারী কর্মজীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হন, বিশেষত সন্তান হওয়ার পর চাকরি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের জন্য ডে-কেয়ারের অভাবের কারণে মায়ের মনের অস্থিরতা দিন দিন বেড়ে চলে।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ম্যানেজার আরাফাত আলী সিদ্দিকী বললেন, “সরকার আসে, পরিবর্তন হয়, কিন্তু নাগরিক অধিকার আর সমস্যার সমাধান হয় না। amiojittechai.com প্ল্যাটফর্মে এখন নাগরিকরা নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরতে পারবেন।” তার কথায় যেন এই নির্যাতিত শ্রমিকদের জন্য এক আশার আলো দেখা দিল। ইউএসএআইডির স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পের আওতায় এই ক্যাম্পেইন দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়ে শ্রমিকদের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তার মাধ্যমে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যে নিজেদের অধিকারের কথা বলতে পারছে, তা তাদের জীবনের জন্য এক নীরব বিপ্লব।

অনুষ্ঠানে গার্মেন্টস কর্মী নার্গিস তার বাস্তব জীবনের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, “আগে আমার মা আমার ছোট মেয়েকে দেখে রাখতো। এখন মায়ের মৃত্যুর পর মেয়েকে একা বাসায় রেখে আসতে হয়। অফিসে ডে-কেয়ার না থাকায় সারাদিন শুধু চিন্তায় থাকি।” এই অসহায়ত্ব শুধু তার একার নয়, বরং প্রতিটি কর্মজীবী মায়ের মনের দুঃখ। আবার সুমাইয়া বলেন, “দিনভর কাজ করতে হয়, কিন্তু বিরতি কিংবা খাবারের ব্যবস্থা নেই। যেন আমরা মানুষ নই, শ্রমের যন্ত্র মাত্র।” তার কথায় যেন আঘাত হানল শ্রমিকদের প্রতি সমাজের কঠোরতা ও উদাসীনতা।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ‘আমিও জিততে চাই’ প্রকল্পটি এমন একটি উদ্যোগ, যা বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠকে প্রাধান্য দেয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি নাগরিকের দাবি ও সমস্যাকে সবার সামনে তুলে ধরা। ‘আমিও জিততে চাই’ ক্যাম্পেইনের আওতায়, মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোকে তুলে ধরতে পারেন, যা সাধারণত সরকারি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না।