বাজার মনিটরিং : বাড়াবাড়ির সুযোগ নাই

বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি এখন একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হইয়াছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে অর্থ উপদেষ্টা বলিয়াছেন যে, বাজার মনিটরিং করা হইবে, কিন্তু 'বাড়াবাড়ি' পর্যায়ে লওয়া হইবে না। মনিটরিং করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হইলেও, 'বাড়াবাড়ি' শব্দটির প্রয়োগ একধরনের অস্পষ্টতা সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হইল, কেন এই 'বাড়াবাড়ির' ভীতি? এবং কাহাদের জন্য এই সতর্কবাণী? বাংলাদেশের বাজার মনিটরিংয়ের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। 

বর্তমান সময়ে দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ নীতিনির্ধারক ব্যক্তি বয়সে প্রবীণ এবং তাহারা অতীতে এই দেশে বহুবার বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করিতে দেখিয়াছেন। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এত মনিটরিং করিয়াও বাজারের স্থিতিশীলতা কেন ফিরিয়া আসে না? বাস্তবতা হইল, মনিটরিং কেবল একটি আংশিক সমাধান, যদি তাহা সঠিকভাবে এবং যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর করা না যায়। বাজারে আসল সমস্যা হইল একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেটের আধিপত্য, যাহা যথাযথভাবে মোকাবিলা করা সহজ কাজ নহে।

আরেকটি বিষয় হইল, বাজার মনিটরিং কথাটির প্রকৃত অর্থ অনেকেই এখনো সঠিকভাবে অনুধাবন করিতে পারেন না। ইহার বিপরীতে আমরা দেখিয়াছি, বাজারে যাহারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, তাহারা প্রায়শই নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন এবং চাঁদাবাজির শিকার হইয়া থাকেন। বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলি একাধারে আমদানি, পরিবহন এবং ডিলারশিপ নিয়ন্ত্রণ করিয়া বাজারকে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালনা করিবার দৃষ্টান্ত আছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার মনিটরিং কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু 'বাড়াবাড়ি' শব্দটির অর্থ বোধগম্য নহে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এইখানে 'বাড়াবাড়ি' শব্দটির কোনো জায়গা নাই। কারণ, বাজার মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি হইবার সুযোগ নাই, বরং তাহা সঠিকভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কার্যকর হওয়া উচিত। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরাইবার জন্য সরকারকে শক্তিশালী নীতি গ্রহণ করিতে হইবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। মূল্য নিয়ন্ত্রণ করিতে হইলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর ওপর কতিপয় গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙিতে হইবে। 

বাজারে সিন্ডিকেটের আধিপত্য ভাঙিবার জন্য প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর যথাযথ প্রয়োগ করিয়া বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে সক্রিয় করিতে হইবে। প্রতিযোগিতা কমিশনের মূল দায়িত্ব হইল অবৈধ যোগসাজশ, মনোপলি ও ওলিগোপলি প্রতিরোধ করা এবং বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বর্তমানে কমিশন যদি বিভিন্ন পণ্যের আমদানি, উৎপাদন এবং বাজারমূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করিয়া যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহা হইলে বাজারে অস্থিতিশীলতা তুলনামূলক হ্রাস পাইতে পারে।

বাজার মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারকদের আরো সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আলু, পিঁয়াজ, ডিম ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরি। অতীতে দেখা গিয়াছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন রহিয়াছে; অথচ হিমাগার মালিকদের তথ্যে দেখা যায়, উৎপাদনে ঘাটতি রহিয়াছে। এই ধরনের তথ্যের গরমিল বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করিতে সহায়তা করে এবং কতিপয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মুনাফা লুটিবার সুযোগ পায়। 

সুতরাং, সরকারের উচিত, সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করিয়া, বাজারে কার্যকরী তদারকি করিয়া মূল্য নিয়ন্ত্রণ করিতে উদ্যোগী হওয়া। স্পষ্টতই, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ফিরাইতে হইলে, সরকারের উচিত সিন্ডিকেট ভাঙিয়া, সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা। বাজার মনিটরিং কেবল একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ, ইহা সমস্যার মূল সমাধান নহে। বাজারে যাহারা ব্যবসায়ী তাহারা বহু দশক ধরিয়া বিবিধ ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন, চাঁদাবাজির শিকার হইয়াছেন। অতএব বাজারকে বাজারের মতো করিয়া চলিতে দেওয়ার কথা বলিয়া থাকে অভিজ্ঞজনেরা।