ইতিহাসে নানকার বিদ্রোহ ও সুখাইড় জমিদারবাড়ি

'নানকার বিদ্রোহ' সিলেট অঞ্চলের একটি কৃষক-আন্দোলন, যা ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ সালে সংঘটিত হয়। জমিদারের ভূমিদাসদের একটি প্রথাকে 'নানকার প্রথা' বলা হতো। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ১৯৫০ সালে জমিদারপ্রথা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। নানকার ছিল এক বর্বর শ্রম শোষণের প্রথা। 'নান' ফারসি শব্দ, এর অর্থ রুটি এবং 'কার' অর্থ জোগান বা কাজ করা; অর্থাৎ 'নানকার' শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয় সেসব কর্মীকে, যারা খাবারের বিনিময়ে কায়িক শ্রম দান করেন। এই নানকার প্রজারা ছিল ভূমিমালিকের হুকুমদাস; প্রজাই নয়, তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও বংশানুক্রমে ভূমিমালিকের দাস হতো।

মূলত সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমার রেঙ্গা পরগনাসমেত এই অঞ্চলে এই সামন্তপ্রথাটি প্রচলিত ছিল। সামন্ত ভূমালিকদের সিলেট অঞ্চলে মিরাশদার এবং বড় মিরাশদারকে জমিদার বলা হতো। জমিদার বা মিরাশদারবাড়ির নিকটবর্তী স্থানে কিছু প্রজার বসবাসের ব্যবস্থা করা হতো, তারাই ছিলেন নানকার প্রজা। বিনা পারিশ্রমিকে জমিদারবাড়ির সার্বক্ষণিক গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত থাকতে হতো তাদের। চুন থেকে পান খসলেই তাদের ওপর চলত অমানুষিক নির্যাতন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৃহত্তর সিলেটের আনুমানিক ৩০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ ছিলেন নানকার। ১৯২২ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় দানা বাঁধতে থাকল নানকার আন্দোলন। লাউতা বাহাদুরপুর অঞ্চলের জমিদারবাড়ির সামনে রাস্তায় স্যান্ডেল বা জুতা পায়ে হাঁটা যেত না। ছাতা টানিয়ে চলা এবং ঘোড়ায় চড়াও ছিল অপরাধমূলক কাজ। দিনদিন জমিদারদের অত্যাচার বাড়তে থাকে; এই অনাচারের প্রতিকার চায় সবাই। তাই গোপনে গোপনে চলে সলাপরামর্শ।

কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে চলতে থাকে নানকার কৃষকসহ সব নির্যাতিত জনগণকে সংগঠিত করার কাজ। ১৯৪৭-এর আগেই তিনি আত্মনিয়োগ করেন নানকার প্রজাদের সংগঠিত করতে এবং এজন্য একাধিক বার গ্রেফতার হন ব্রিটিশ ভারতের নিরাপত্তা আইনে। সে সময় অজয় ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে কাজ করেছেন শিশির ভট্টাচার্য্য, ললিত পাল, জোয়াদ উল্ল্যা, আব্দুস সোবহান ও শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্যসহ আরো কয়েক জন। তাদের নেতৃত্বে নানকার কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে জমিদারের বিরুদ্ধে। বন্ধ হয়ে যায় খাজনা দেওয়া, এমনকি জমিদারদের হাট-বাজারের কেনাকাটা পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় জমিদার ও তার লোকজনকে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

১৭ আগস্ট ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রাবণীসংক্রান্তি । প্রথম দিনের উৎসব-আরাধনা শেষে পরের দিনের মনসাপূজার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গভীর রাতে বিছানায় গা এলিয়েছেন সানেশ্বর উলুউরির মানুষ। কিন্তু ১৮ আগস্ট পহেলা ভাদ্র ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে জমিদারের পেটোয়া বাহিনী আক্রমণ করে সানেশ্বরে। ঘুমন্ত মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম ভেঙে দিগবিদিক পালিয়ে পার্শ্ববর্তী উলুউরিতে আশ্রয় নেয়। উলুউরি গ্রামে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন নানকার আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পাল। তাদের নেতৃত্বেই উলুউরি ও সানেশ্বর গ্রামের কৃষক, নারী-পুরুষ প্রস্তুতি নেয় এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে সুনাই নদীর তীরে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয় জমিদার- বাহিনীর সঙ্গে। কিন্তু লাঠিসোঁটা নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কৃষকরা। ঘটনাস্থলেই শহিদ হয়েছিলেন ব্রজনাথ দাস, কুটুমণি দাস, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস ও অমূল্য কুমার দাস। এর পনেরো দিন আগে রজনী দাস নদীর তীরে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে শহিদ হয়েছিলেন। সেদিন আহত হয়েছিলেন হৃদয় রঞ্জন দাস, দীননাথ দাস, অদ্বৈত চরণ দাসসহ বহু বিপ্লবী নেতাকর্মী। বন্দি হন অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল, প্রকাশ চন্দ্র দাস, হিরণ বালা দাস, প্রিয়মণি দাস, প্রমোদ চন্দ্র দাস, মনা চন্দ্র দাসসহ অনেকে। অত্যাচারে অন্তঃসত্ত্বা অপর্ণা পাল চৌধুরীর গর্ভপাত ঘটে ঘটনাস্থলেই। শ্রীহট্ট, রাজশাহী ও ঢাকা জেলে তিনি প্রায় পাঁচ বছর বন্দি ছিলেন।

সুখাইড়ে নানকার বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্রজবাসী দাস। এই বিদ্রোহের পর ব্রজবাসীর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কেউ বলে জমিদাররা ব্রজবাসীকে জীবন্ত পুঁতে ফেলেছিল, কেউ বলে ব্রজবাসী খাসিয়া পাহাড়ের পথে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার কালে এ কথাও বলে গিয়েছিলেন, জমিদারের বশ্যতা স্বীকার করার থেকে পাহাড়-জঙ্গলে গিয়ে বাঘ-ভালুকের সঙ্গে লড়াই করে মরাও ভালো। ব্রজবাসীর সঙ্গে গ্রামের আরো কিছু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুখাইড়ে বিদ্রোহের সূচনা হয়। একদিন এক রমণীকে লম্পট জমিদারের কাছে আসার জন্য ডাক পাঠায়। কিন্তু সে জমিদারদের ডাকে চিরাচরিত প্রথামতো ছুটে না এসে বরং জমিদারদের লোকদের কড়া কথা শুনিয়ে দেয়। খবর শুনে জমিদার তার দলবল নিয়ে নানকার সেই রমণীকে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আটক করে রাখে। জমিদাররা এমনটি প্রায়শই করে থাকত, কারো কোনো প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না। কিন্তু সেদিন জমিদারদের এই ন্যক্কারজনক প্রথার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সুখাইড়ের নানকার প্রজারা একযোগে জমিদারবাড়িতে চড়াও হয়ে সেই বন্দি নারীকে উদ্ধার করে আনেন।

এসব ঘটনার পরই আন্দোলনে উত্তাল হয় সারা দেশ। নানকার প্রজাদের এই আত্মত্যাগের ফলেই ১৯৫০ সালে তৎকালীন সরকার জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। 

লেখক: পুলিশ সুপার, নৌ-পুলিশ, ফরিদপুর অঞ্চল