দুর্ভোগে বানভাসী মানুষ

টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙ্গামাটিতে দুই পথচারী নিহত হয়েছে। চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নিখোঁজ রয়েছে একজন। এদিকে যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা, তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই দেশের নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের নদী তীরবর্তী অনেক নিম্নাঞ্চল। তিন পার্বত্য অঞ্চলের বন্যার নাজুক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এদিকে, সিলেট, সুনামগঞ্জে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।ভারী বর্ষণে রাঙ্গামাটির রাইখালী ইউনিয়নের কারিগরপাড়ায় পাহাড় ধসে দুই পথচারী নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, রাঙ্গামাটির রাইখালী-বান্দরবান প্রধান সড়কে কারীগরপাড়ায় চলন্ত এক সিএনজি অটোরিকশা ও পথচারীর ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে মাটি চাপা পড়া দুই পথচারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এদিকে, পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা আরো বেড়েছে। বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বেড়ে শহরের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে গেছে। খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে মাইনী নদীর পানি। পানিবন্দি কয়েক হাজার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারিবিন্দু ঘাটের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সবকটি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হয়েছে গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ এবং জৈন্তাপুর উপজেলা। নদীর পানি উপচে সীমান্তবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সিলেট-গোয়াইনঘাটের সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহরের হালুয়ারঘাট সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে মৌলভীবাজারেও।

কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, রাজারহাট ও নাগেশ্বরী উপজেলার নদ-নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।

তিস্তা নদীর পানি বেড়ে লালমনিরহাটসহ নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। এতে হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী উপজেলার ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামে নতুন করে পানি ঢুকেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৭ হাজার পরিবার। রংপুরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও কাউনিয়ার কাছে তিস্তা নদীর পানি এখনো বিপত্সীমা বরাবর বইছে। এসব এলাকায় এখনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি।

এদিকে, দেশের সকল প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তত্সংলগ্ন ভারতের সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের উওরাঞ্চল, আসাম ও মেঘালয়ের বিস্তৃত এলাকায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় সকল প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদী সারিয়াকান্দি এবং কাজিপুরে বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর বিভাগের সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, সোমেশ্বরী, ফেনী, হালদা,  মাতামুহুরী, সাঙ্গু, ধরলাসহ প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাবে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, লালমিনরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনিত হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া ইত্তেফাককে জানান, ইতিমধ্যেই দেশের নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ৫২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৪২.২৫ সেন্টিমিটার ও সুনামগঞ্চ পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার এবং সিলেট পয়েন্টে ১০০ সেন্টিমিটার, হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বাল্লা পয়েন্টে ২১০ সেন্টিমিটার, সোমেশ্বরী নদীর পানি কমলাকান্দা পয়েন্টে ৬৬ সেন্টিমিটার, কংস নদীর পানি জারিয়াজাজইল পয়েন্টে ৯৯ সেন্টিমিটার, সাঙ্গু নদীর পানি দোহাজারি পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার ও বান্দরবান পয়েন্টে ১৫০ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি অমলসিদ পয়েন্টে ১৪১ সেন্টিমিটার, শেরপুর পয়েন্টে ৮০ সেন্টিমিটার, শেওলা পয়েন্টে ১২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১৯০ সেন্টিমিটার ও ফুলছড়ি পয়েন্টে ১৯০ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদেও পানি চিলমারি পয়েন্টে ২৩০ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৬০ সেন্টিমিটার, ঘাগট নদের পানি গাইবান্ধা পয়েন্টে ২১০ সেন্টিমিটার, ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে ২৬৫ সেন্টিমিটার, মাতামুহুরী নদীর পানি চিরিংগাপ পয়েন্টে ৬২ সেন্টিমিটার, জালদা নদীর পানি নারায়ণহাট পয়েন্টে ১৫১ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীর পানি কমলগঞ্জ পয়েন্টে ১৮০ সেন্টিমিটার, মনু নদীর পানি মৌলবীবাজার পয়েন্টে ১০০, মনু রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ১৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট অঞ্চলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি

সিলেট অঞ্চলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। শনিবার সন্ধ্যায় সুরমা, কুশিয়ারা, সারিসহ বিভিন্ন নদীর পানি হু-হু করে বাড়ছে। সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নবীনগর-ধারার গাঁও এলজিইডির পাকা সড়ক ঢলের তোড়ে ভেসে গিয়ে কয়েক ফুট গর্তের সৃষ্টি হয়। শহরের সাথে কয়েকটি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের অবস্থা খুবই খারাপ। ১১টি উপজেলা বন্যাকবলিত। জেলা প্রশাসন ২০ লক্ষ টাকা ৫০০ টন চালের জন্য চাহিদাপত্র প্রেরণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে।

এদিকে ভারতের আসাম ও মনিপুর রাজ্যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বরাকের দুকূল ছাপিয়ে পানি নামছে ভাটিতে। প্রতিমুহূর্তে আসামের বরাক নদীর পানি বড়ছে। সকালে কিছুটা স্থির হলেও দুপুরের পর থেকে আবার সুরমা-কুশিয়ারা আববাহিকায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। সিলেটের জনপদ, ফসলিজমি, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ডুবছে। এদিকে কুশিয়ারায় প্রবল চাপ সৃষ্টি হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কয়েকটি ডাইক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। গতকাল সন্ধ্যায় জকিগঞ্জে ডাইক ভেঙে পানি ঢুকার উপক্রম হয়। দক্ষ জনবলের অভাবে জরুরি ভিত্তিতে ডাইক মেরামত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড হিমশিম খাচ্ছে।

আগামী কয়েকদিন সিলেট অঞ্চলের নদীসমূহের পানি সমতলে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনার কথা সংশ্ল্লিষ্ট মহলকে অবহিত করে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. নিজামুল হক ভুঁইয়া । অন্যদিকে মেঘালয় ও আসামে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেটবাসী শঙ্কিত। 

সূত্র মতে, বন্যা শুরুর পূর্বে সিলেটে নদী ভাঙন, ঝুঁকিপূর্ণ  স্থানে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙা অংশ বন্ধকরণ, মেরামত কাজ, বাঁধের স্লোপ প্রতিরক্ষা কাজ,  বিকল্প বাঁধ নির্মাণসহ জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয় জুনের শেষে। এর মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের মোট ১৮২টি পয়েন্টে জরুরি কাজ বাস্তবায়ন শুরু হলেও অনেকগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে আবার জরুরি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ শ্রমিক ও আগ্রহী ঠিকাদারের সংকট থাকায় এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড বেশ বিপাকে পড়েছে।

এদিকে, ভোগান্তির যেন শেষ হচ্ছে না বান্দরবানে বন্যাকবলিত মানুষদের। শুক্রবার বন্যার পানি কিছুটা কমলেও শনিবার সকাল থেকে প্লাবিত এলাকাগুলোতে বন্যার পানি বেড়েই চলেছে। প্লাবিত হচ্ছে আরো নতুন নতুন এলাকার ঘরবাড়ি। অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় বন্যায় পানিবন্দি হয়েছে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিকেরও বেশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩১টি। কিন্তু প্লাবিত এলাকাগুলোর তুলনায় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

তিস্তায় বন্যা পরিস্থির অবনতি

ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দুপুরে তিস্তা নদীর বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবীর বিন আনোয়ার। তিনি ডিমলা উপজেলার ফরেস্টের চর, ছোটখাতার চরসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।

ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শনিবার পানি ব্রহ্মপুত্র বিপত্সীমার ৪২ সেন্টিমিটার, তিস্তা বিপত্সীমার ১২ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদী বিপত্সীমার ১৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিপত্সীমার নিচে থাকলেও করতোয়া নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলার নদী তীরবর্তী শতাধিক চরাঞ্চল ও বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া পানির প্রবল স্রোতে নদ-নদীর তীরে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন।