কৃষকদের ভোগান্তি দূর করিতে হইবে

ইত্তেফাকের খবরে প্রকাশ, 'বাগমারায় আলুবীজ ও সার নিয়ে ভোগান্তিতে কৃষক'। কৃষকদের ভোগান্তির মূল কারণ এই দুই কৃষি উপকরণের মূল্য অত্যধিক। রাজশাহীর বাগমারায় রবি মৌসুমের প্রধান ফসল আলু। এখানকার কৃষকগণ বর্তমানে আলু চাষের জন্য মাঠে নামিয়া পড়িয়াছেন; কিন্তু তাহাদের অভিযোগ, নায্যমূল্যে আলুবীজ ও সার তাহারা পাইতেছেন না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করিয়া বাজারে এই দুই কৃষি উপকরণের দাম বাড়াইয়া দিয়াছেন অস্বাভাবিক হারে। ৩ হাজার ১৮০ টাকার বীজ ক্রয় করিতে এখন লাগিতেছে ৪ হাজার ৪০০ টাকা। তাহা হইলে কৃষকরা চাষাবাদ করিবেন কীভাবে?

বর্তমানে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। চাউল, তৈল, চিনি, ডিম ইত্যাদির পাশাপাশি ইদানীং আলুও আলোচনার পাদপীঠে উঠিয়া আসিয়াছে। কেননা এই বৎসর ফেব্রুয়ারি মাসে যেইখানে আলুর মূল্য ছিল ৩০-৩৫ টাকা, সেখানে এখন ইহার মূল্য হইয়া পড়িয়াছে ৬০-৭০ টাকা পর্যন্ত। বলিতে গেলে আলু লইয়া দেশে একধরনের হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে। আলু উৎপাদনে শীর্ষ জেলাসমূহে তথা বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও মুন্সীগঞ্জের হিমাগার পর্যায়েও বাড়িয়াছে আলুর দাম। কৃষকরা তাই এইবার আলু উৎপাদনে মনোযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করিতেছেন: কিন্তু তাহাদের সহজ শর্তে বীজ ও সার না দিলে তাহারা কীভাবে মনোবল ও উৎসাহ-উদ্দীপনা ধরিয়া রাখিবেন? ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আলুর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ হইতে কমাইয়া ১৫ শতাংশ করিয়াছে। ইহার পাশাপাশি ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও তুলিয়া লইয়াছে। তদুপরি টিসিবির ট্রাকে ৪০ টাকা কেজি মূল্যে আলু বিক্রির উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য: কিন্তু ইহাতেও কাজ হইবে না যদি আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে আলু উৎপাদন করিতে না পারি।

বাজারে তৈলের মূল্য কমাইতে আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ১০ শতাংশ হইতে কমাইয়া ৫ শতাংশ করা হইয়াছে। ডিমের মূল্য সহনীয় রাখিতে নূতন করিয়া আরো ১৮ কোটি ৮০ লাখ ডিম আমদানির অনুমতি দিয়াছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই সকল উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের উৎপাদনকারীদের লইয়াও চিন্তা করিতে হইবে। চলতি বৎসর অতিবৃষ্টি ও বন্যায় অনেক সবজিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হইয়াছে। তাহাতে আলুর ওপরও বাড়তি চাপ পড়িয়াছে। দেশে বৎসরে আলুর চাহিদা ৯০ লক্ষ টন। সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদিত হইয়াছে ৭৫ লক্ষ টন। সেই হিসাবে বাজারে চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০-১৫ লাখ টন আলুর ঘাটতি রহিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আলু এমন এক কৃষিপণ্য, যাহা বিভিন্ন তরকারিতে ব্যবহৃত হয়। ইহা ভাতেরও বিকল্প খাদ্য। তাই আলু চাষাবাদের ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহ প্রদানে অবহেলা কাম্য নহে। অন্যদিকে সার ছাড়া বিভিন্ন ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়; কিন্তু বর্তমানে কোথাও কোথাও সারের সংকট কৃষকদের ভাবাইয়া তুলিয়াছে। যেমন-বন্যার ধকল কাটাইয়া উঠিতে না উঠিতেই নতুন করিয়া দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেশ কিছু এলাকার কৃষক। চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজি, ভুট্টা ও বোরো আবাদের ক্ষেত্রে ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের সংকটে রহিয়াছেন তাহারা। সার যাহা মেলে, তাহাও সরকারনির্ধারিত মূল্যের চাইতে বস্তায় ৩০০ হইতে ৩৫০ টাকা অধিক রাখিতেছেন ডিলাররা। রবিশস্যের বীজ বপনের সময়কাল ১৬ অক্টোবর হইতে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এই সময়ে মূলত নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। চারা গজানোর পর ব্যবহার করা হয় ইউরিয়া সার। নন-ইউরিয়া সারগুলির একটি হইতেছে ডিএপি। এই সারের সংকটে রহিয়াছে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলাও। তাই ডিএপি সারের সংকট দূর করিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সচেষ্ট হইতে হইবে।

বীজ বা সারের সংকট থাকিলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়া যায়, কমিয়া যায় উৎপাদনও। ইহাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। সুতরাং যাহারা অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করিতেছে, প্রয়োজনে তাহাদের চিহ্নিত করিয়া আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।