ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধকে একটি আমেরিকান যুদ্ধ বলা যেতে পারে এবং এই যুদ্ধ শুরুর কারণ উদ্ঘাটন করতে গেলে হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই আঙুল উঠবে। এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের হাত ধরে। তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি যেন ২০২২ সালে রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি শান্তিচুক্তি বাতিল করেন এবং চুক্তি বাতিল হলে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে। এই চুক্তি ছিল একটি বিশাল নথি, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা উভয় পক্ষের দ্বারা স্বাক্ষরিত ও অনুমোদিত ছিল। ক্রেমলিন ও কিয়েভ উভয়ের কাছেই এই চুক্তি গ্রহণযোগ্য ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত বাইডেন ও জনসনের পরামর্শে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
তাদের পরামর্শ ছিল জেলেনস্কি যেন তাদের সামরিক সহায়তার ওপর ভরসা করেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পশ্চিমা সামরিক শক্তি এতটাই শক্তিশালী যে তা রাশিয়ার যে কোনো হামলা প্রতিরোধ করতে পারবে এবং কিয়েভকে আর মস্কোর সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড় দিতে হবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, জেলেনস্কিকে একটি কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই কৌশলের পেছনে কোনো শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল না, ছিল না কোনো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বা ন্যায়বিচারের কথা। বরং এই পরামর্শের পেছনে ছিল রাশিয়ার প্রতি গভীর ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব।
এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য শান্তির পরিবর্তে সংঘাতকে উসকে দেয় এবং আলোচনার পরিবর্তে যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেয়। এদিকে মার্কিন কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে শুরু করছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা রুশ-বিরোধী মনোভাব ও প্রচারণার কারণে কংগ্রেস তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে এমন একটি যুদ্ধে অর্থায়ন করল, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি ছিল না।
এই যুদ্ধের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সিআইএ ইউক্রেনের একটি নির্বাচিত ও নিরপেক্ষ সরকারকে সরিয়ে দেয়। এই অভ্যুত্থানের পর পূর্ব ইউক্রেনের রাশিয়ান ভাষাভাষী ও রাশিয়া- সংস্কৃতিভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু হয়। পূর্ব ইউক্রেনের এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ান সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার প্রভাবাধীন ছিল। এমনকি এই অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আগ থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীরা আশা করেছিলেন যে, ইউক্রেনের জনগণ এই পরিবর্তন মেনে নেবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি যখন তারা বুঝতে পারলেন, এই অভ্যুত্থান ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে, তখনো তারা চোখ বন্ধ করে রইলেন। তারা ইউক্রেনের সরকারকে ইইক্রেনের সেসব জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর অনুমতি দিলেন, যারা মস্কোর প্রতি তাদের অনুরাগ প্রকাশ করেছিল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, ক্রিমিয়া অঞ্চলের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেয়।
এই পুরো ঘটনার মধ্যে একজন ব্যক্তি, যিনি চুপ করে থাকতে পারেননি, তিনি হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার দিক থেকে চিন্তা করলে আসলে পুতিনকে দোষ দেওয়া যায় না। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র জানত যে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রাশিয়া মেনে নেবে না। জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ন্যাটো পূর্ব দিকে এগোবে না। পূর্ব ইউরোপে শান্তিপূর্ণ মুক্তি এবং জার্মানির পুনরায় একত্রীকরণের বিনিময়ে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পোল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয় এবং ন্যাটো তার ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মস্কোর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
পুতিন তার পূর্বসূরির এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং ২০১৪ সালের অভ্যুথানের পরিকল্পনাকারীদের চিন্তাভাবনা দেখে নড়েচড়ে বসেন। তিনি রাশিয়ান ইউক্রেনীয়দের রক্ষায় এগিয়ে আসেন। যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইস্তানবুলে আলোচিত রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তি ভেঙে দেয় এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদের প্রলোভন দেখায়, তখন পুতিনের সামনে একমাত্র বিকল্প ছিল ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে রুশশক্তি ব্যবহার করা।
এমন পরিস্থিতিতে পুতিনের প্রতিক্রিয়ার দিকে আঙুল তোলা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? একটু ভেবে দেখুন, যদি মেক্সিকোতে চীন অস্ত্র মজুদ করতে শুরু করে, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
এই ইতিহাসটি যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশি প্রচলিত নয়। মূলধারার গণমাধ্যম ও সরকারি স্কুলগুলো বরাবরই স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে রাশিয়াকে 'খলনায়ক' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে রাশিয়াকে খলনায়ক হিসেবে দেখার এই চিন্তাধারার সুযোগ নিয়ে বাইডেন জেলেনস্কিকে প্রতিশ্রুতি দেন, 'যতদিন প্রয়োজন, যা কিছু দরকার, আমরা দেব।' তবে বাইডেন কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি যে, এই সাহায্য কতদিন চলবে এবং তা দিয়ে ঠিক কী অর্জন করা হবে।
বাইডেনের এই যুদ্ধ মার্কিন করদাতাদের প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে এবং ইউক্রেনের ৬ লাখ সৈনিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই যুদ্ধ কখনো কংগ্রেস দ্বারা অনুমোদিত হয়নি। এটির পরিচালনায় ইউক্রেনে অনেক আমেরিকান সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা কন্ট্রাক্টর জড়িত। অধিকাংশ সামরিক সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের মূল সম্পদ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন সেনাদেরকেই ব্যবহার করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাইডেন এমন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন, যা রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত করতে সক্ষম এই অস্ত্র পরিচালনা শুধু মার্কিন সেনা এবং গোপন প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব। এর মাধ্যমে রাশিয়ার ১২০ কিলোমিটার ভেতরে একটি গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণ্য ছাড়াই রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে জাতিসংঘের কোনো সম্মতি নেই।
যুদ্ধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের একটি মাধ্যম। কিন্তু এটি সবচেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পথ। এই পথ সব সময়ই শেষ অবলম্বন হওয়া উচিত। অন্য পথ খোলা থাকলে কখনোই যুদ্ধের পথে হাঁটা উচিত না। তাই সংবিধানে ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। এই নীতির প্রণেতা জেমস ম্যাডিসন যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যদি প্রেসিডেন্টরা নিজেরাই শত্রু নির্বাচন ও যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে তারা প্রেসিডেন্ট নয়, ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স হয়ে উঠবেন।
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সি একটি ব্যর্থ প্রশাসনের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি হয়তো ভাবছেন, ইতিহাস তাকে সম্মানের চোখে দেখবে, যদি তিনি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে এই যুদ্ধে সহযোগিতা করেন। কিন্তু এখন যুদ্ধের পরিবর্তে দরকার শান্তিপ্রিয় নেতৃত্বের, যা অবিলম্বে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে কি আমরা এমন শান্তিপ্রিয় প্রশাসনের আশা করতে পারি?
লেখক: নিউ জার্সি সুপিরিয়র কোর্টের সাবেক বিচারক নিউ জার্সি
হেরাল্ড থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন