খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : উত্তরণের পথ কী?

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম বলে, চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বাজারদরের নীতি নির্ধারণ করে: অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্যের জোগান অধিক হইলে তাহার মূল্য কম থাকিবে। একইভাবে জোগান কম হইলে মূল্য বৃদ্ধি পাইবে। ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশে এই নিয়ম যেন বাস্তবতা হারাইয়াছে! পর্যাপ্ত জোগান থাকিবার পরও খাদ্যপণ্যের মূল্য কমিতেছে না, বরং বাড়িয়াই চলিতেছে। শীতকাল আসিয়া গিয়াছে, বাজারে শীতকালীন সবজির ছড়াছড়ি। তবুও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির উৎস হিসাবে বিবেচিত বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজির মূল্য তাহাদের নাগালের বাহিরে। অপরদিকে দেশে উৎপাদিত বিদেশি ফলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র-জোগান বাড়িতেছে, তথাপি মূল্য হ্রাস পাইবার বালাই নাই। কমলা, মাল্টা ও ড্রাগনের ন্যায় বিদেশি ফল এখন দেশেই চাষ হইতেছে। উৎপাদন বাড়িবার কারণে আমদানি খরচের উপর চাপ কমিতেছে। ইহার পরও দাম কমাইবার কোনো লক্ষণ নাই! একসময় আমদানি করা এই ফলগুলির যেই মূল্য ছিল, এখন দেশে উৎপাদন করিয়াও প্রায় একই মূল্যে বিক্রি হইতেছে। ইহা মানিয়া লওয়া স্বভাবতই কঠিন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে খাদ্যমূল্যস্ফীতি গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠিয়াছে। বাজারব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কৃষকরা তাহাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাইতেছেন না, অথচ ভোক্তারা দ্বিগুণ মূল্যে সেই পণ্য ক্রয় করিতে বাধ্য হইতেছেন। শীতকালীন সবজি ও দেশে উৎপাদিত ফলের মূল্য কমিলে দরিদ্র মানুষ পুষ্টির সহজলভ্য উৎস পাইতে পারিত। অথচ বাস্তবে তাহা সম্ভব হইতেছে না। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে যে, বাংলাদেশের ৩১ শতাংশ শিশু এখনো পুষ্টিহীনতায় ভুগিতেছে। তাহাদের জন্য শীতকালীন সবজি ও মৌসুমি ফল সাশ্রয়ী করিতে পারিলে পুষ্টির এই ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা যাইত।

আমিষ জাতীয় খাবার, যেমন-মাছ-মাংস তো বহুদিন ধরিয়াই নিম্ন আয়ের মানুষের সাধ্যের বাহিরে। একদিকে আমিষ কিনিতে পারে না, অন্যদিকে নিরামিষ খাবার খাইয়া কোনোরকম দিনাতিপাত করাটাও এখন কষ্টসাধ্য হইয়া পড়িয়াছে তাহাদের জন্য। পুষ্টিকর ফল খাওয়া তো একপ্রকার বিলাসিতাই বলা যায়! পুষ্টি ও খাদ্যের এই লাগামহীন মূল্যের বাস্তবতায় নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে বাঁচিয়া থাকিবার আশা করিতে পারে?

বিশ্বের উন্নত দেশগুলি যেইভাবে এই সমস্যার সমাধান করিয়াছে, তাহা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হইতে পারে। নেদারল্যান্ডস কৃষিপ্রযুক্তির জন্য বিশ্বে প্রসিদ্ধ। তাহারা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াইয়া উৎপাদন খরচ কমাইয়াছে এবং বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করিয়াছে। ভারত মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমাইয়া কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করিয়াছে। চীন মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করিয়া বাজার স্থিতিশীল করিতে সক্ষম হইয়াছে। বাংলাদেশও তাহাদের অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা লইতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করিতে হইলে সর্বাগ্রে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাইতে হইবে। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যে ভর্তুকি চালু করা গেলে তাহাদের জন্য একটি মানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাইবে। ইহার জন্য সরকারের আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

খাদ্যপণ্যের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নহে, এটি একটি মানবিক সংকটও বটে। এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন সঠিক নীতি, সক্রিয় উদ্যোগ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। । প্রান্তিক মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরাইয়া আনিবার দায়িত্ব আমাদের সকলের। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থার সুষ্ঠু উন্নয়ন নিশ্চিত করিতে পারিলে এই সমস্যা হইতে উত্তরণ সম্ভব।