এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এক ঢিলে তিন পাখি

বিশ্বে মানবজাতির ইতিহাসে নানান ধরনের সংক্রামক রোগ মহামারি হইয়া দেখা দিয়াছে, যাহা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বারংবার কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করিয়াছে। আমাদের এই চ্যালেঞ্জের তালিকায় নূতন সংযোজন হইতে পারে জিকা ভাইরাস। সম্প্রতি বাংলাদেশে জিকা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হইবার পর ইহা লইয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হইয়াছে। অথচ জিকা ভাইরাসের মতো সংক্রামক রোগের ইতিহাস, কার্যপ্রক্রিয়া এবং ইহার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন একটা সচেতনতা গড়িয়া উঠে নাই। কারণ এই ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের দেশের মানুষ খুব একটা পরিচিত নহে। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা বনের এক বানর হইতে মানুষের মধ্যে ছড়াইয়া পড়া এই ভাইরাসটি প্রথম দিকে তেমন বিপজ্জনক বলিয়া মনে করা হয় নাই। অল্প কয়েক দশক ধরিয়া ভাইরাসটি আফ্রিকা ও এশিয়ার নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০১৫ সালে ব্রাজিলে ঘটিয়া যাওয়া ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এই ভাইরাসকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকটে পরিণত করে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের প্রভাব সবচাইতে বেশি ভয়াবহ। কারণ ইহা গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। যাহার ফলে বাচ্চার মস্তিষ্ক পূর্ণাঙ্গ আকৃতি লাভ করিতে পারে না এবং প্রতিবন্ধী হইয়া জন্মগ্রহণ করে।

জিকা একটি আর্দ্র আবহাওয়ার ভাইরাস, যাহা মূলত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই একই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগও বহন করে। মানুষের দেহে প্রবেশ করার পর এই ভাইরাস রক্তপ্রবাহে ছড়াইয়া পড়ে এবং স্নায়বিক কোষে আক্রমণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীই সুস্থ হইয়া উঠেন এবং মৃত্যুহারও বেশ কম। তবে ইহার প্রকৃত ভয়াবহতা লুকাইয়া রহিয়াছে ইহার দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায়। বিশেষত নবজাতক ও শিশুদের ক্ষেত্রে ইহা স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। ব্রাজিলের প্রাদুর্ভাব চলাকালীন, প্রায় ২০ হাজার নবজাতক এই ভাইরাসের প্রভাবে প্রতিবন্ধী ও বিকলাঙ্গ হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিল।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রত্যেক বৎসর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাইতেছে, যাহার প্রধান বাহক সেই এডিস মশা। স্বাভাবিকভাবেই, এই অঞ্চলে জিকা ভাইরাসের বিস্তারের আশঙ্কা প্রবল। তাহার উপর নগরায়ণের অনিয়ন্ত্রিত প্রসার ও সঠিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আমাদের দেশের জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াইয়া দিতেছে। জিকা ভাইরাস শনাক্ত হইবার পর বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ সতর্কবার্তা দিয়াছেন। যদিও এখনো ইহার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যায় নাই বটে, তবে ডেঙ্গুর চাইতেও ইহা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করিতে পারে। বিশেষত, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সাবধানতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিকা ভাইরাস ভয়ংকর রূপ ধারণ করিবার পূর্বেই বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, প্রয়োজন পড়িলে মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ লইতে হবে। মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস, যথাসময়ে কীটনাশক প্রয়োগ এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো যাইতে পারে। তাহার পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের জন্য আলাদা সুরক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাহারা যেন মশার কামড় এড়াইয়া চলিতে পারেন, সেই জন্য সুরক্ষিত কাপড় পরা ও মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা যাইতে পারে। এখনো কার্যকরী ভ্যাকসিন না থাকায় জিকা ভাইরাস সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব নহে, তবে ইহার বিস্তার রোধ করা সম্ভব। প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা। তাই ভ্যাকসিনের জন্য হা-হুতাশ না করিয়া জিকা ভাইরাসের বাহক অর্থাৎ এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে সর্বাগ্রে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা মানে এক ঢিলে তিন পাখি। কারণ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু জিকা নহে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বিস্তারের লাগামও টানা সম্ভব হইবে।