আইন প্রণয়নের মহান উদ্দেশ্য, মানুষ যেন নিজেদের মধ্যে লাঠালাঠি, হানাহানি না করে আইনের আশ্রয় নেয় এবং আইনের বিচার পায়। রাষ্ট্রের পবিত্র সংবিধান মানুষকে আইনের বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। বিচারপ্রার্থী মানুষ আইনের আশ্রয় নেবেন এবং বিচারকরা আইন পর্যালোচনায় বিচারের রায় প্রদান করবেন। আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আইনগত দায়িত্ব পালন করেন। বিচারের ক্ষেত্রে বিচারকদের দায়িত্ব অপরিসীম। এ কারণে বিচারকদের রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনগুলো অবশ্যই জানতে হবে। সাক্ষ্য (আইন ৫৭ ধারা) বিচার কার্যপরিচালনা সম্পর্কে দেওয়ানি নিয়ম ও বিধি আইনে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। রাষ্ট্রের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকদের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তসমূহ অবশ্যই মানতে হবে।
বিচারপ্রার্থী মানুষকে আইনসম্মত বিচার প্রদান করতে হলে বিচারকদের উপযুক্ত বুনিয়াদি ট্রেনিং দিয়ে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। কারণ আইন ও বিচারকে সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এখানে উপযুক্ত বুনিয়াদি ট্রেনিং ছাড়া কাউকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করা একেবারেই উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে এই অনুচিত কাজটিই করা হচ্ছে। একজন ছাত্র বাংলাদেশের জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে কোনো ধরনের বুনিয়াদি ট্রেনিং ছড়া বিচারের দায়িত্ব প্রদান করা হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরা তিন মাস বিভিন্ন এজলাসে ব্যস্ত বিচারকদের পাশে বসছেন। সে সময়কে ট্রেনিং বলে চালানো হচ্ছে। যেখানে পুলিশের অফিসাররা দুই বছর বুনিয়াদি ট্রেনিং করে কাজে যোগ দেন। বিচারকদের উপযুক্ত ট্রেনিং না দেওয়ার কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিচারকরা তাদের অজান্তেই আইন, উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও সংবিধান লঙ্ঘন করছেন। আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কপি প্রদান করার পরও অনেকাংশে দেখা যায় বিচারকরা উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের খেয়ালমতো রায় প্রদান করছেন।
যেমন ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০(২) ক ধারা মতে, পুকুর ছাড়া অন্যান্য জলাশয়, হাট-বাজারের সম্পত্তি, বন (ফরেস্ট)-এর সম্পত্তি ও ফেরিঘাটের সম্পত্তি রাষ্ট্রের প্রজারা ব্যক্তি অধিকারে রাখতে পারবেন না। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে মালিক হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারপক্ষ থেকে কোনো দলিল করে দিলেও অথবা আদালত থেকে কোনো রায় দিলেও মালিক হবেন না। পুকুর ব্যতীত অন্যান্য জলাশয় অর্থাৎ নদী-বিল, -বিল, হাওর-বাঁওড়, জলাধার ইত্যাদি। কারণ হলো ঐসব প্রাকৃতিক সম্পদ জনগণকে দিয়ে দিলে রাষ্ট্রটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাবে।
উল্লিখিত আইন উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত দেখানোর পরও যে সম্পত্তি সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ানে বিল উল্লেখ আছে, সে সম্পত্তি নিয়ে মামলায় দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা জজ (৩) আদালত ব্যক্তি মালিকানার ভুয়া দলিলের পক্ষে রায় দিলেন (৩১৯/১০ অন্য আপিল)। জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৩ (৪) ৬ ধারা জারি হওয়ার পর রাষ্ট্রে আর কোনো অধীনস্থ প্রজা সৃষ্টি করা যাবে না। ঐ আইনে জমিদারদের অধীনে যারা সরাসরি অধীনস্থ প্রজা ছিলেন যেমন-জলকর, কোর্ফা, পত্তন, চাকরান প্রজা, কৃষিরায়ত, বর্গাচাষি ইত্যাদি নামে তাদের সরকারের অধীনে সরাসরি মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অধীনস্থ প্রজা সৃষ্টি করলে, যিনি করবেন তার সম্পত্তি সরকার বরাবরে বাজেয়াপ্ত হবে। ৭৫(ক) ও ৯৩ ধারা (এসএ অ্যান্ড টি অ্যাক্ট)।
কিন্তু রাষ্ট্রে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা অর্থাৎ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি), ব্যক্তিস্বার্থে, নিজেদের পকেট ভারী করার তাগিদে জমিদারদের কাছ থেকে পত্তন নেওয়া পুকুর ও অন্যান্য সম্পত্তি নিজেদের দখলে নিয়ে অন্যত্র লিজ প্রদান করছেন। ঐ সব ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে মূল আইনসহ সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য সিদ্ধান্ত দাখিল করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারের ঐ সব অসাধু কর্মকর্তার পক্ষে রায় হয়। সরকার পক্ষ যেন নালিশি পুকুর অন্যত্র লিজ প্রদান করতে না পারেন মর্মে ২০১৫ সালে আদেশ হলো। সরকারপক্ষ আট বছর পর মিস আপিল ১৪/২৩ আনয়ন করেন। অতঃপর দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা জজ (৩) আদালত রাষ্ট্রের সংবিধান ও উচ্চ আদালতের অসংখ্য সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সরকারের অসাধু কর্মকর্তার পক্ষে রায় দিলেন। একটি সম্পত্তি সিএস, এসএ ও আরএস খতিয়ানের রাস্তা। রাস্তা ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়া যাবে না, এটা ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদারও জানেন। কিন্তু দিনাজপুরের যুগ্ম জেলা জজ আদালত-(৩) অবৈধ দখলদারের পক্ষে রায় দিলেন। মামলা নম্বর ৪৭/১৭ অন্য আপিল, রায় ১৯/১০/২০২৩। বিচারের বাস্তব অবস্থা বোঝানোর জন্য আপিল আদালতসমূহের উদাহরণ দেওয়া হলো। এ থেকে বোঝা যাবে নিম্ন আদালতের অবস্থা।
মামলা নিষ্পত্তির সময়ের ক্ষেত্রে, যে মামলা দুই বছর সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, সে মামলা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০ বছরেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালের মামলায় আইনে বলা আছে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের মামলা আরম্ভ হয় ২০১২/২০১৩ সালে এখনো ২৫ ভাগ মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। সরকারপক্ষের সাক্ষী আদালতে এসে এসএ রেকর্ড খাজনার দাখিলা, অর্থাৎ সরকারি দলিলের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছেন, বলার কেউ নেই। আদালতে পেশকার, সেরেস্তাদার, পিয়ন সব মামলার ব্যক্তিগতভাবে ডায়ারি মেইনটেন করছেন, মোয়াক্কেলদের কাছে আইনজীবীদের মতো তারিখে তারিখে টাকা নিচ্ছেন।
তাদের বক্তব্য, 'আমরা পরিশ্রম করব আর টাকা নেবে উকিলরা। জেলা জজরা বলেন রায় বিপক্ষে আপিল করবেন, নালিশ কেন। বিচারপতিরা আদালত ইন্সপেকশন করতে এলে আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো অফিশিয়াল প্রোগ্রাম থাকে না। সে কারণে জজশিপের কোনো বিচারক সম্পর্কে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ হয় না। কোনো বিচারক বিচার বিক্রি করলেও অভিযোগ করার জায়গা নেই। বিচারকদের রায়ের বিরুদ্ধে ও বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রেখে একটি নালিশি কাউন্সিল গঠন করা আবশ্যক। বিচারপ্রার্থী মানুষ যেন স্বল্প সময়ের মধ্যে আইনের বিচার পায়, হয়রানি ও খরচান্ত হতে না হয় ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত সংস্কার হওয়া আবশ্যক।
লেখক: আইনজীবী, দিনাজপুর