ক্রীড়াঙ্গনে আরেকটি সাফল্যের মাইলফলক

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হইতে ইদানীং কিছু ভালো খবর পাওয়া যাইতেছে, যাহা আশাব্যঞ্জক। এই সকল খবর যেমন আমাদের উজ্জীবিত করে, তেমনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধও করে বটে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমরা এখনো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব অলিম্পিকে আলো ছড়াইতে পারি নাই। অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করাই সার হইতেছে। তবে ইতিমধ্যে ক্রিকেটে আমাদের অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে শুধু ছেলেরাই নহে, এখন আমাদের প্রমীলারাও অংশগ্রহণ করিতেছেন। ফুটবলে আমরা তৈলাক্ত বাঁশে বানরের উঠানামার মতো একবার কিছুটা আগাইতেছি তো পরক্ষণে আবার পিছাইয়া পড়িতেছি। যদিও প্রমীলা ফুটবলাররা আমাদের কিছুটা আশাবাদী করিয়া তুলিয়াছেন। সেই তুলনায় বরং হকিতে আমাদের অবস্থান ভালো; কিন্তু হকি আমাদের আলোচনার পাদপীঠে নাই বলিলেই চলে।

আশির দশকে আমাদের দেশে হকি কিছুটা উন্মাদনা তৈরি করিয়াছিল। ফুটবলের পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জের মানুষ হকি খেলিতে শুরু করিয়াছিল। স্কুল-কলেজগুলিতে গাছের ডাল ভাঙিয়া স্টিক বানাইয়া টেনিস বল দিয়া হকি খেলিবার চর্চা শুরু হইয়ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই জনপ্রিয়তা আর ধরিয়া রাখা যায় নাই। তবে হকিতে আবার জোয়ার আসিবার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। বিশেষ করিয়া এই মুহূর্তে সুখবর হইল, এই প্রথম হকির কোনো বিশ্বকাপে খেলিবে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ওমানের মাসকটে অনুষ্ঠিত এশিয়ান অনূর্ধ্ব-২১ হকিতে থাইল্যান্ডকে ৭-২ গোলে পরাজিত করিয়া বাংলাদেশ এই যোগ্যতা অর্জন করে। গতকাল শেষ ম্যাচে তাহারা চীনকে ৬-৩ গোলে হারাইয়া ১০ দলের মধ্যে হইয়াছে পঞ্চম। আগামী বৎসর ডিসেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় যুব হকি বিশ্বকাপে এশিয়া হইতে অংশগ্রহণ করিবে সাতটি দল। এই সাতটি দলের মধ্যে বাংলাদেশও খেলিবে-এই খবরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। যদিও আমাদের হকির জাতীয় তথা মূল দল বিশ্বকাপে খেলিবার যোগ্যতা অর্জন করে নাই, তথাপি যুব দলের বিশ্বকাপে খেলিবার এই সংবাদকে কোনোভাবেই খাটো করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। তাহাদের ঠিকভাবে গড়িয়া তুলিতে পারিলে একদিন তাহারা বড়দের বিশ্বকাপেও খেলিবার যোগ্যতা অর্জন করিবেন বলিয়া আশা করা যায়। আমরা জাতীয় যুব হকি দলের সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

বাংলাদেশ যুব হকি দলের কোচ মওদুদুর রহমান (শুভ) এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন যে, ছেলেরা প্রচণ্ড পরিশ্রম আর লড়াই করিয়া এই সাফল্য অর্জন করিয়াছে। ১৮ জন খেলোয়াড়ই বিকেএসপির ছাত্র। সেই হিসাবে তাহাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ও ঐক্য রহিয়াছে। এখন আমাদের দেশে তাহাদের জন্য যথাযথভাবে ঘরোয়া খেলা ও প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। স্পন্সরের ব্যবস্থা করাসহ সম্ভাবনাময় এই সকল খেলোয়াড়ের পার্শ্বে আমাদের দাঁড়াইতে হইবে সর্বান্তকরণে। ক্যাম্পে তাহারা দৈনিক মাত্র ৪০০ টাকা ভাতা পান। ইহা দ্বারা তাহাদের মানোন্নয়ন কীভাবে সম্ভব? এই ভাতা অবশ্যই বাড়াইতে হইবে। ওমান হইতে ফিরিয়া আসিবার পর বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন তাহাদের সংবর্ধনা দিয়াছে। তাহাদের জন্য ঘোষণা করিয়াছে পাঁচ লক্ষ টাকার পুরস্কার। অর্থাৎ দলের ১৮ খেলোয়াড় ও তিন কোচ-কর্মকর্তা প্রত্যেকে পাইবেন ২৩ হাজার ৮০৯ টাকা মাত্র। এই অর্থ যেমন যৎসামান্য, তেমনি দেশের জন্য এত বড় সাফল্য অর্জনের পুরস্কার হিসাবে তাহা বেমানানও বটে।

বাংলাদেশের ক্রীড়ার ইতিহাসে এই ঘটনা একটি মাইলফলক। এখন আসন্ন বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য তাহাদের সকল রকমের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন। এই বিশ্বকাপে ২৪টি দল অংশগ্রহণ করিবে এবং বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হইবে ইউরোপ, ল্যাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলি। তাই বিশ্বকাপের আগেভাগে বিশেষত ইউরোপের দলগুলির বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নিলে তাহা ফলপ্রসূ হইতে পারে। এশিয়ান অনূর্ধ্ব-২১ হকি টুর্নামেন্টে আমরা ছয় ম্যাচে মাত্র একটিতে হারিয়াছি। তিনটি জয় ও দুটি ড্রয়ের দেখা পাইয়াছি, অর্থাৎ খেলোয়াড়দের মধ্যে জয়ের মানসিকতা তৈরি হইয়াছে। এখন শুধু তাহাদের সমর্থনটা দরকার। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক ও একজন যুবকের নেতৃত্বাধীন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিকট হইতে সেই সমর্থনটা ভবিষ্যতেও পাওয়া যাইবে বলিয়া আমরা প্রত্যাশা রাখি।