ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের সামনে 'একটি সুযোগ' তৈরি হইয়াছে বলিয়া সকলে বলিয়া আসিতেছেন। বর্তমানে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারও জনপ্রত্যাশা পূরণে কাজ করিয়া যাইতেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণয়ন করা হইতেছে সংস্কারের রূপরেখা। তথাপি যেই সকল কারণে এইরূপ গণবিস্ফোরণ ঘটিল, জনগণ রাস্তায় নামিয়া আসিল, তাহার সুরাহা হইতেছে বা হইবে কি না, সেই প্রশ্ন থাকিয়াই যায়। ইহার কারণ, দেশব্যাপী যেন। পূর্বের সংস্কৃতিরই রাজ চলিতেছে! কতিপয় রাজনৈতিক দল এবং তাহাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন অন্যায়, অপকর্মে লিপ্ত হইয়া উঠিতেছেন। জোর-জবরদখল হইতে শুরু করিয়া আর্থিক লেনদেন এবং ক্ষমতার দাপট দেখাইবার ন্যায় গুরুতর অন্যায়-অপরাধ সংঘটিত হইতেছে তাহাদের দৌরাত্ম্যপনায়। সংশ্লিষ্ট দলের শীর্ষ পর্যায় হইতে ক্ষেত্রবিশেষে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে, সতর্ক করা হইতেছে এবং নিরুৎসাহিত করা হইতেছে এহেন কর্মে লিপ্ত থাকিবার ব্যাপারে। তথাপি তাহারা যেন ক্রমাগত লাগামহীনই হইয়া উঠিতেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠিতে পারে, চলমান বাস্তবতায় 'চিরচেনা এই সংস্কৃতি' কীভাবে আবারও মাথা তুলিবার সুযোগ পাইতেছে? অনেকের দাবি, ইহা 'পুরাতন সংস্কৃতি'। ফলে নজিরবিহীন রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পরও একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তিকে সহজভাবে গ্রহণ করিতেছে না সাধারণ মানুষ।
প্রশ্ন হইল, এই অপসংস্কৃতি বিস্তারের মূল কারিগর কি কেবল রাজনৈতিক দলগুলি বা তাহাদের অঙ্গসংগঠন? অবশ্যই নয়। এই সকল ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের ভূমিকাও কম নহে! প্রশাসন কিংবা পুলিশ হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেরও এই ক্ষেত্রে দায় রহিয়াছে। সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারীর সম্পৃক্ততা ব্যতীত রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যপনা সম্ভবপর হইতে পারে না।
ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠিতে শুরু করিয়াছে, বর্তমান সময়ে কতিপয় রাজনৈতিক দল বা তাহাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিবার ক্ষেত্রে শেল্টার দিতেছে পুলিশ-প্রশাসনের একশ্রেণির আমলা। বিভিন্ন সেক্টরের কাজ বা প্রকল্প ভাগাভাগি হইতে শুরু করিয়া নানাবিধ ক্ষেত্রে প্রশাসন তাহাদের বিশেষ সুবিধা দিতেছে। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে দেশব্যাপী ধড়পাকড়ের প্রয়োজন পড়িলে, সেইখানেও তাহাদের ইশারায় কাজ করিতেছে পুলিশ-প্রশাসন। ইহা নিঃসন্দেহে বাজে দৃষ্টান্ত। অতীতে রাজনৈতিক নেতাদের সহিত যোগসাজশ করিয়া পুলিশ-প্রশাসন নানাবিধ অন্যায় ও অপরাধকর্মে নাম লিখাইয়াছিল। তাহাদের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষফল কতটা মারত্মক, ভয়াবহ হইতে পারে, তাহা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। আবারও অন্যায়-অত্যাচার, চাঁদাবাজি, দখলবাজির মাধ্যমে গণ-ভোগান্তি সৃষ্টি করিবার ফল কী হইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়।
প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন, প্রস্তাব জমা দেওয়া এবং এই সমস্ত বিষয়ের ভিত্তিতে 'নূতন বাংলাদেশের' স্বপ্ন দেখার প্রবণতা আমাদের জন্য নূতন কিছু নহে। সঠিক পন্থায় আগাইলে পুলিশ-প্রশাসনে পরিবর্তন আসিবে বটে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির সংস্কার করিবে কে বা কাহারা? তাহাদের সংস্কার তো তাহাদের নিজেদেরই করিতে হইবে। মনে রাখা দরকার, জনবিদ্রোহ পূর্বেও হইয়াছে এই ভূখণ্ডে। তবে তাহার ফসল জনগণের ঘরে উঠিয়াছে কি না, সেই প্রশ্ন রহিয়াই গিয়াছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের প্রচণ্ড অস্বস্তিকর ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির পর ক্ষণিকের জন্য আশা জাগে বটে, কিন্তু ক্ষণকাল পরেই যেন রাষ্ট্র ফিরিয়া যায় আগের চেহারায়ই! ইহার কারণ, শাসকেরা, রাজনৈতিক নেতারা কিংবা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করিয়া আবারও জনগণকে শাসন করিতে শুরু করে। তবে ইহার ফল যে আত্মঘাতী হইতে পারে, সেই শিক্ষা আমরা গ্রহণ করি না। আর এই কারণেই পুলিশ-প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতাদের উপর হইতে 'কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না' তকমা সরে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বের উপর একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকখানি নির্ভরশীল। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের যেই লক্ষ্য লইয়া আগাইয়া চলিয়াছে, সেইখানে এমন ব্যবস্থার অবতারণা করিতে হইবে, যাহাতে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মী কিংবা প্রশাসন-পুলিশ কেহই জনগণের উপর শাসন, শোষণ ও একটি বলয় তৈরি করিয়া গণভোগান্তি তৈরি করিতে না পারে।