মানুষ চাহে ‘কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন’

বিভিন্ন দেশে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, যাহা সিরিয়ায়ও ঘটিয়া গেল। আজিকার বিশ্বে জনগণ ‘পরিবর্তন’ চাহে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ইহা বর্তমানে প্রবণতায় পরিণত হইয়াছে। পরিবর্তন, সংস্কার, রূপান্তর শব্দগুলি জনগণের কাছে বেশ পরিচিত হইয়া উঠিয়াছে। তবে মানুষ আসলে পরিবর্তন নহে, চাহে ‘কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন’। উহা এক দলের পরিবর্তে আরেক দলের শাসন বা এক নেতার জায়গায় আরেক নেতা নহে, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, ব্যবস্থার পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। এই সকল ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসিলেই কেবল জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হইতে পারে; কিন্তু যদি ইহার বিপরীত কিছু ঘটে, তথা পরিবর্তনের পরেও গণপ্রত্যাশা পূরণ না হয়, তাহা হইলে বিক্ষুব্ধ জনতা আবারও রাস্তায় নামিয়া আসে। ফলে আবারও হাতবদল ঘটে ক্ষমতার। মূলত এই কারণেই বিভিন্ন দেশে বারংবার আন্দোলন হইতে দেখা যায়!

কিন্তু দুঃখের বিষয়, যাহারা নতুন করিয়া ক্ষমতায় আসেন তাহারা ইহা হইতে শিক্ষা লাভ করেন না। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে সরকার বদলের পর সেইখানকার রাজনীতিতে যিনি বা যাহারা চালকের আসনে আসেন, তাহাদের কথাবার্তা বা কাজে নূতন কোনো চমক দেখা যায় না। তাহাদিগকে জনগণের ভাষা বুঝিতে হইবে।

বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, অতীতে বহু বার আন্দোলন-সংগ্রাম, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া শাসকের পরিবর্তন ঘটিবার পরও জনগণ রাজপথ ছাড়ে নাই! ইহার কারণ, তাহাদের ভাষ্যমতে—নতুন নেতৃত্বের মধ্যে তাহারা পূর্বের শাসকগোষ্ঠীর শ্যাডো দেখিতে পায়! দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বিঘ্ন করা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিক করা, জানমালের হেফাজত করা, সর্বোপরি দলমতনির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়িয়া তুলিবার মতো বিষয়গুলিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুব একটা নজর দেয় না। ইহার ফলে জনপ্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আরো রক্তপাত অনিবার্য হইয়া উঠে।

আমাদের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য হইল, স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকের অধিক সময়েও দেশে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা বিকশিত হয় নাই। ইতিহাস হইতে নেতারা শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। ফলে ভবিষ্যতের দিকে না তাকাইয়া কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত থাকিতে দেখা যায়। অন্যদিকে, ক্ষমতার বাহিরে থাকা দল চায়, যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় ফিরিয়া আসিতে। মূলত এই কারণেই তাহারা পথের কাঁটা পরিষ্কার করিতে একে অন্যের বিরুদ্ধে উঠিয়া পড়িয়া লাগে। মূলোৎপাটন, উত্থাতেই উন্মত্ত হইয়া উঠে। ফলে দিনশেষে জনগণের যে প্রত্যাশা, জনতার যে দাবি, তাহা থাকিয়া যায় অন্ধকারেই।

বহু দেশের রাজনীতি এই আবর্ত হইতে বাহির হইতেই পারিতেছে না। ফলে দলগুলি এবং তাহাদের নেতাদের দেশপ্রেমহীন দলতন্ত্র এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার উৎকট মোহ গণতন্ত্র বিকাশের সম্ভাবনাকে ক্রমশ সংকুচিত করিয়া তুলিতেছে। রাজনৈতিক নেতাদের ইহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে। বিরোধী পক্ষের মূলোৎপাটন, তাহাদের চরিত্র হরণে অধিক মনোযোগী না হইয়া বরং গণপ্রত্যাশা পূরণই তাহাদের এক নম্বর প্রায়োরিটি হইতে হইবে; দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে।