শিশুর সমস্যা মূলত রাষ্ট্রেরই সমস্যা

একটি রাষ্ট্রে শিশুরা যেইভাবে বাড়িয়া উঠিবে, ভবিষ্যতে সেই রাষ্ট্র তদনুযায়ী গঠিত হইবে। শিশুদের সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থতার প্রতীক। অথচ, সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রকাশিত তথ্য আমাদের শঙ্কিত করিতেছে। গণসাক্ষরতা অভিযান ও ব্র্যাক শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত। ৩৬.৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদ্যালয় বিমুখতা এবং ২৮.৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক ক্ষতির লক্ষণ পরিলক্ষিত হইয়াছে। প্রধান কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হইল বৰ্তমান সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা। গত জুলাই হইতে চলমান সংঘাত, রাস্তার সহিংসতা, মিছিল, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশি নির্যাতনের চিত্র শিশুদের মানসিক স্থিতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করিয়াছে। যখন একটি শিশুর চোখের সামনে সহিংসতা চলিয়া যায়, তাহা তাহার কোমল মনকে আঘাত করে। শিশুদের মধ্যে ভয়, শঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের এই সংকট হইতে উত্তরণের জন্য আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সর্বাগ্রে প্রয়োজন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যদিও ইহার সমাধান সহজ নহে। শিশুরা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বাড়িয়া উঠিবার অধিকার রাখে। শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই নহে, কোভিড মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তাহাদের মানসিক অবস্থার উপর গভীর ছাপ ফেলিয়াছে। বিদ্যালয় দীর্ঘ বন্ধ, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়াছে। অতঃপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, তাহাদের জীবনে নতুন সংকট যোগ করিয়াছে। অতিমাত্রায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে শিশুরা নেতিবাচক ও সহিংস কনটেন্টের সংস্পর্শে আসিতেছে। এই প্রভাব তাহাদের মধ্যে এক প্রকার হতাশা, বিষণ্নতা, এবং একাকিত্ব সৃষ্টি করিতেছে। এই সকল কারণেই দেখা যায়, অনেক শিশু পড়ালেখায় অমনোযোগী হইয়া পড়িতেছে, বিদ্যালয়ে যাইতে চাহিতেছে না এবং মেজাজ খিটখিটে হইয়া উঠিতেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সৃজনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষকদের শিশুর মানসিকতা বুঝিয়া তাহাদের প্রতি যত্নবান হইতে হইবে। বিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যাইতে পারে, যাহাতে তাহারা ক্লাসে শিশুদের মানসিক উদ্বেগ দূর করিতে সঠিক ভূমিকা পালন করিতে পারেন। পরিবারও শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারে। অভিভাবকদের উচিত শিশুর অনুভূতির প্রতি মনোযোগ প্রদান এবং তাহাদের সমস্যাগুলিকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা। শিশুরা যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে, ইহার জন্য অভিভাবকদের সজাগ থাকিতে হইবে। সমাজ ও রাষ্ট্র মিলিয়া এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট হইতে হইবে, যেইখানে শিশুরা সুরক্ষিত ও আনন্দময় শৈশব কাটাইতে পারে। তাহাদের জন্য সহিংসতা ও আতঙ্কমুক্ত একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। অর্থাৎ যেইভাবেই হউক, শিশুমনে সৃষ্ট ভয়ের শিকড় উপড়ে ফেলিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, একটি শিশু শুধুই তাহার পরিবারের সম্পদ নহে, সে ইহার পাশাপাশি জাতির ভবিষ্যৎ। তাহাদের মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলা করিলে আমরা ভবিষ্যতে এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হইব। শিশুরা যেন দুঃস্বপ্নে নয়, বরং আনন্দে ও সৃজনশীলতায় ভরা শৈশব কাটাইতে পারে, ইহাই হউক আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তাহাদের জন্য একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।