অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে প্রকৃত আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে চট্টগ্রাম কাস্টমসে প্রকৃত ও সত্ ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে দেশের সিংহভাগ আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ী কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পণ্য আটক কিংবা ব্লক করা হয়। এমনকি একটি পণ্য সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শুল্কায়ন হওয়ার পর খালাসের মুহূর্তে আটক করা হয়। আবার আমদানি পণ্য কাপড় হলে তা ঠিক থাকুক বা না থাকুক এটি ব্লক করা যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। তা শত ভাগ কায়িক পরীক্ষা ছাড়া ছাড়পত্র পাবে না। কিন্তু এমনও অনেক ঘটনা রয়েছে কন্টেইনারের পর কন্টেইনার মিথ্যা ঘোষণা পণ্য চলে গেছে তা কেউ জানে না।

অন্যদিকে কন্টেইনার ব্লক করার পরও কন্টেইনার কীভাবে খালাস হয়ে যায় তা কেউ জানে না। চট্টগ্রাম কাস্টমসে এ ধরনের অসংখ্য নজির রয়েছে। কিন্তু তার একটিরও চূড়ান্ত সাজা হওয়ার তেমন একটা নজির পাওয়া যায় না। তাছাড়া নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়। যথারীতি নির্দিষ্ট পণ্যের ঘোষণা দিয়ে কন্টেইনারও আসে। কিন্তু পরীক্ষা করলে দেখা যায়, কোনটির ভেতর পাথর, কোনটির ভেতর বালি, ছাইভস্ম কিংবা অত্যন্ত নগণ্য মূল্যের মালামাল এসেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের পরিসংখ্যান নিলে এই ধরনের অসংখ্য নজির পাওয়া যাবে। বিদেশে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বা শাস্তির কোনো নজির নেই বললেই চলে। আবার পণ্যের কম বা বেশি মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচারের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে কাস্টমসের শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। অথচ প্রকৃত মূল্যের বাকি অর্থ হুন্ডি কিংবা অবৈধ পথে ঠিকই বিদেশি রপ্তানিকারকের নিকট পাঠানো হয়। অনুরূপভাবে বেশি মূল্য দেখিয়ে সরাসরি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। এমনও অনেক বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বাংলাদেশে আমদানিকারক। আবার বিদেশে যে প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য আমদানি করছে ঐ প্রতিষ্ঠানের মালিকও ঘুরে ফিরে নিজে কিংবা নিজেদের লোকজনের।

চট্টগ্রাম কাস্টমসে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পণ্য আটক করে তার মধ্যে অনেক মিথ্যা ঘোষণার পণ্য হিসেবে ধরা পড়ে। সন্দেহের কারণে অসাধু আমদানিকারকের কারণে প্রকৃত সত্ ব্যবসায়ী হয়রানি সহ বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একটি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার পর নির্দিষ্ট সময় জরিমানা ছাড়া থাকতে পারে। এরপর থেকে তাকে পোর্টের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। এটি বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা থাকে। একটা পর্যায়ে তার ডেমারেজ চার্জ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, পণ্যের আমদানি মূল্য স্থানীয় বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আটকা পড়লে বন্দর, শিপিংসহ অন্যান্য চার্জ অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া কারখানার কাঁচামাল নির্দিষ্ট সময় না পৌঁছালে লেবার চার্জ, বিদ্যুত্, গ্যাস, নির্দিষ্ট বাজার-মার্কেটিং, লোকবল বাবদ বিশাল অঙ্কের ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে দীর্ঘদিন পরে আসা কাঁচামাল দিয়ে উত্পাদিত পণ্যের উত্পাদন মূল্য বেশি হওয়ায় বাজার হারায়। লোকসানে পড়ে ক্রমান্বয়ে শিল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য উত্পাদন করে রপ্তানি করতে না পারলে তা ক্রেতা গ্রহণ করে না। পণ্য স্টক লট হয়ে পড়ে থাকে। রপ্তানি না হওয়ায় ব্যাংকের টাকা দেনায় পড়ে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ বা লে-অফ করতে বাধ্য হয়। একইভাবে অন্যান্য পণ্য রপ্তানিকারকগণও অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমসের পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির কারণে শিল্প কল-কারখানার মালিকগণ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তাদের কাপড়, কেমিক্যালসহ এক্সেসরিজ সামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা এবং এর উত্তরণে ইতিমধ্যে কাস্টমসের কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের প্রস্তাব পেশ করেছে। একইসঙ্গে কাস্টমসের হয়রানি ও পণ্য ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতার ক্ষতির বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে এবং সন্দেহের সুযোগে কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী আর্থিক লাভবানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ফাইল ডেপুটি কমিশনার পর্যন্ত শেষ করে পণ্য খালাস নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তা করা হয় না। অভিযোগ রয়েছে ওপরে পাঠানোর কথা বলে আর্থিক লাভবান হওয়ার সকল ধরনের কলা-কৌশল অবলম্বনের পথ বেছে নেওয়া হয়। অবশ্য চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মো. ফখরুল আলম জানিয়েছেন, কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তার নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের মতে তারা নিয়মিত ব্যবসা করছেন বলে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে পরবর্তী সময়ে আর হয়রানিতে পড়তে চান না।