জীবনে প্রথম যে সংবাপত্রের সঙ্গে পরিচিত হই, সেটি দৈনিক ইত্তেফাক। চলনবিল অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের নাম ‘চাঁচকৈড় নাজিমুদ্দিন হাইস্কুল’। ব্রিটিশ বাংলায় স্থাপিত সেই লব্ধপ্রতিষ্ঠ স্কুলে বহুকাল থেকে ডাকযোগে দুই কপি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা আসত। সাম্প্রতিককালের মতো সেসময় সমাযোজন সুবিধা না থাকায় পত্রিকাটি প্রকাশের পরদিন পাওয়া যেত। সত্তর দশকের শেষের দিকে ক্লাস সেভেনে থাকাকালে ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
একদিন নাইন-টেনের অগ্রসর ছাত্রদের ভেতর একজন আমাকে বোঝায়, ‘এটা প্রাত্যহিক পত্রিকা, এখানে প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া সংবাদ ছাপা হয় এবং পড়লে অনেক কিছু জানা যায়।’ তারপর টিফিনের ফাঁকে একটু সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে গিয়ে পেপার পড়ি। সে সময় পত্রিকায় পাতায় ছুটির দিনে সিনেমার প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখা যেত। ছবির পোস্টারগুলো ঐ তরুণ বয়সে মনে বেশ আলোড়ন তুলত।
সেই থেকে পত্রিকাপাঠে হাতেখড়ি। তরুণ বয়সে পত্রিকা বলতে দৈনিক ইত্তেফাককেই বুঝতাম। আসলে ইত্তেফাক একটি ব্র্যান্ড, পণ্যচিহ্ন এবং প্রতীক। গণমানুষের পত্রিকা বলতেই ইত্তেফাক। এখন তো বাজারে অনেক পত্রিকা। বুকস্টলে গিয়ে কোনো ব্যক্তি হয়তো অন্য পত্রিকাই কিনবে, তবু দোকানিকে গিয়ে বলে বসবে, ‘ভাই একটা ইত্তেফাক দ্যান তো।’ তাহলে বিষয়টি এবার অনুধাবন করেন, ইত্তেফাকের প্রভাব কতটুক। এ জন্যেই এটি একটি ব্র্যান্ড, বিশেষ শ্রেণির পণ্য। গণমানুষের হয়ে পত্রিকাটি ভাষা অন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একসময় ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনেও দৈনিক ইত্তেফাক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সবকিছু কাভার করে। আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার প্রাক্কালে ১৯ জুলাই ২০২৪ ইত্তেফাক পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল: ‘অগ্নিগর্ভ দেশ, নিহত ২৫’। ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে কীভাবে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর যুদ্ধে ব্যবহূত মারণাস্ত্র দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, তা দৈনিক ইত্তেফাক জাতির সামনে উপস্থাপন করে। ইত্তেফাক গণ-মানুষের পত্রিকা এবং গণ-মানুষের সঙ্গে রয়েছে দেশ ভাগের পর থেকে। আর মাত্র তিন বছর পরই পত্রিকাটির প্লাটিনাম জুবিলি পালিত হবে। গণ-মানুষের পক্ষে আওয়াজ তোলে বলেই এত দীর্ঘসময় পত্রিকাটি এখনো ইউক্যালিপটাসের মতো উচ্চশিরে টিকে রয়েছে।
এই পত্রিকা পাঠের নেশা থেকে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিস্তর পাঠ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে। এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করায় ভালো কলেজে পড়ার জন্য ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার সুযোগ আসে। সেখানে অধ্যয়নকালে ‘বাংলাদেশ সাহিত্য পরিষদ’-এর সদস্যপদ গ্রহণ করি এবং নিয়মিত বই সংগ্রহের মাধ্যমে সাহিত্যপাঠের আনকূল্য আস্বাদন করি। পত্রিকার পাতায় নিজের নাম দেখার ইচ্ছে থেকে লেখালেখি শুরু করি। সে সময় আমি নিয়মিত রহস্যপত্রিকায় গল্প লিখি। খুব ইচ্ছে হলো সাহিত্যপাতায় লিখব। সব পত্রিকায় প্রায়শ লেখা পাঠাই, কেউ ছাপে না। ]
একবার মেহেরপুরে গেলে রফিকুর রশীদ রিজভী ভাইকে বলি, ‘ভাই আমার লেখা কোনো পত্রিকাই ছাপে না।’ তিনি বলেন, ‘আপনার সবচাইতে ভালো লেখাটা কাটছাঁট ও পরিমার্জন করে ইত্তেফাকে পাঠিয়ে দিন। ওরা যদি আপনার একটা লেখা ছাপে, তাহলে সবাই ছাপবে।’ দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতার জন্য লেখা পাঠালে এবার প্রতিক্রিয়া জানায়। দিক নির্দেশনা দিয়ে সংশোধনের জন্য বলেন। পুনর্বার পাঠানো হলে সাহিত্যপাতায় আমার গল্প ছাপা হয়। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে সেদিন ২০ কপি পত্রিকা কিনে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিতরণ করি।
তারপর আর লেখাছাপার জন্যে উদ্বেগ পোহাতে হয়নি। ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হওয়ার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমশ দেশের বেশিরভাগ শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতা আমার গল্প ছাপে। আমার সবকিছু লেখার নেপথ্যে অনুপ্রাণন হিসেবে কাজ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক। আমার লেখক জীবনের পথচলা এবং আমার গর্ব ইত্তেফাক। সবসময় প্রিয় সংবাদপত্রের সঙ্গে থাকায় আজও মনে আছে, অন্যসব পত্রিকা চলিত রীতিতে লেখা আরম্ভ করলেও ইত্তেফাকের সংবাদ সনাতন সাধু রীতিতেই লিপিবদ্ধ হতো। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে চলিত রীতিতে ফেরে ঐতিহ্যবাহী এই পত্রিকাটি। তবে সম্পাদকীয় এখনো সাধু ভাষায় লেখা হয়। সেখানেও ইত্তেফাক অনন্যসাধারণ।
লেখক: সাহিত্যিক এবং সামরিক কর্মকর্তা (অব.)