সচিবালয়ে অগ্নিনিরাপত্তা না থাকিলে কোথায় থাকিবে?

বড়দিনের রাত্রিতে বাংলাদেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে সম্প্রতি সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই ঘটনায় বহু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নথি ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে, যাহা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলিতে পারে। যদি সচিবালয়ের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এইরূপ অগ্নিকাণ্ড ঘটিতে পারে, তাহা হইলে দেশের অন্য কোনো ভবন কি আদৌ নিরাপদ থাকিতে পারে? এই প্রশ্ন আজ আমাদের সামনে প্রকট হইয়া ধরা দিতেছে।

সচিবালয়ে অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব ও সংগতিপূর্ণ অবকাঠামো না থাকিবার কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যগণ সময়মতো কাজ শুরু করিতে বাধাগ্রস্ত হইয়াছেন বলিয়া জানা যায়। এমনকি গাড়ি প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত গেট না থাকায় অগ্নিনির্বাপণের কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে। ইহা একটি দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সচিবালয়ে যেই অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা স্থাপন করা হইয়াছে, তাহা কেন কাজ করিল না? ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানাইয়াছেন যে, সচিবালয়ের অগ্নিনির্বাপণের জন্য ১৯টি ইউনিট পাঠানো হইয়াছিল; কিন্তু বাস্তবে ১০টি ইউনিট কাজ করিয়াছে, কারণ কয়েকটি গাড়ি ভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে বাধার সম্মুখীন হইয়াছিল। ছয়তলা হইতে ৯ তলা পর্যন্ত আগুন ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করিতে দীর্ঘ সময় লাগিয়াছে। 

এই ঘটনাটি দুর্ঘটনা, না নাশকতা- তাহা তদন্তের মাধ্যমে উদ্‌ঘাটিত হইবে বলিয়া আমরা আশা রাখি; কিন্তু তাহার পূর্বেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠিয়া আসে। প্রথমত, একই সময়ে ভবনের দুই প্রান্তে কীভাবে আগুন লাগিল? দ্বিতীয়ত, আগুন নিভাইতে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় কেন লাগিল? গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হইয়াছে, সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের গেট এমনভাবে স্থাপন করা উচিত ছিল, যাহাতে ফায়ার সার্ভিসের যানবাহন সহজেই প্রবেশ করিতে পারে। ইহার অভাবে অগ্নিনির্বাপণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হইয়াছে। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক 'ক্রাউড কন্ট্রোল ফোর্স' নামে একটি ইউনিট গঠন করা হইয়াছিল। ইহার কাজ ছিল অগ্নিকাণ্ডের সময় মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা, যাহাতে আগুন নিভানোর কাজে বিঘ্ন না ঘটে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে উহা ভাঙিয়া দেওয়া হয়, যাহার ফলে পরিস্থিতি আরো জটিল হইয়াছে। দুঃখজনকভাবে বুধবার রাতে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী পানির পাইপ বহন করিতে গিয়া ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান। এই দুর্ঘটনা এড়ানো যাইত যদি সংলগ্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ করিয়া দেওয়া হইত। 

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সাবেক এক কর্মকর্তা জানাইয়াছেন-সরকারি অফিসসমূহে অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের আধিক্য রহিয়াছে। ইহা ভবনসমূহকে একটি 'ফায়ার খামার'-এর ন্যায় বিপজ্জনক জতুগৃহে পরিণত করিয়াছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়িবার অঙ্গীকারের যুগে অপ্রয়োজনীয় আসবাব কেনার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা দেখিতে পাই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার জন্য উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সিংগাপুরের সরকারি ভবনসমূহে বাধ্যতামূলক অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা আছে, যাহা নিয়মিতভাবে আপডেট করিয়া পরিদর্শন করা হয়। জাপানের ভবনসমূহে উন্নত অগ্নিনিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যেমন হিট রেসিস্ট্যান্ট বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ও স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ও বেসরকারি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার জন্য কড়া আইন প্রয়োগ করা হয় এবং অগ্নিনির্বাপণ মহড়া বাধ্যতামূলক। 

বাংলাদেশ সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের সাম্প্রতিক ঘটনা ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য একটি শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবনে এইরূপ অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা প্রমাণ করে যে, দেশের অন্য ভবনসমূহও একই ধরনের ঝুঁকিতে রহিয়াছে। অগ্নিকাণ্ডের পর এই ঘটনাগুলির তদন্তের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখিবার জন্য এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।