গত মঙ্গলবার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি 'অতি সাধারণ অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ' খবর আমাদের দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। যশোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আজহারুল ইসলাম তাহার গাড়িচালক হাবিবুর রহমানকে অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা শেষে নিজে গাড়ি চালাইয়া বাড়ি পৌছাইয়া দেন। মজার ব্যাপার হইল, ঐ সময় জেলা প্রশাসক ছিলেন চালকের আসনে আর গাড়ির ভিতরে প্রশাসক যেই আসনে বসেন, সেইখানে ছিলেন গাড়িচালক হাবিবুর রহমান। একজন গাড়িচালকের বিদায়বেলায় এমন বিরল দৃষ্টান্ত আজিকার সমাজে বেশ বিরল!
জানা যায়, গাড়িচালক হাবিবুর রহমান দীর্ঘ ৪০ বছর ধরিয়া কর্মরত ছিলেন যশোর জেলা প্রশাসকের পরিবহন পুলে। কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় জেলা প্রশাসকের গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। নিয়ম অনুযায়ী, যেই সকল কর্মকর্তার সরকারি গাড়ি রহিয়াছে, তাহারা গাড়িপ্রতি মাসে ১৮০ লিটার তেল বরাদ্দ পান। তবে মুশকিল হইল, গাড়ির বেশির ভাগ চালকের বিরুদ্ধে এই তেল লুটপাটের পুরাতন অভিযোগ রহিয়াছে। বিভিন্ন অজুহাতে বরাদ্দের দ্বিগুণ পর্যন্ত তেল তুলিয়া থাকেন গাড়িচালকেরা। সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা কিংবা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত গাড়িচালকরা এই অপকর্ম করিয়া থাকেন।
কিন্তু হাবিবুর রহমান ছিলেন এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম-বরাদ্দের তেলেই সর্বদা মাস শেষ করিতেন তিনি। অন্যদের বিরুদ্ধে যেইখানে 'সরকারি তেল চুরির বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যায়, সেইখানে হাবিবুর রহমান বরাদ্দকৃত তেল দিয়াই যশোরের ন্যায় একটি বৃহৎ জেলার প্রশাসকের গাড়ি চালাইয়া গিয়াছেন বৎসরের পর বৎসর। খালি চোখে দেখিলে ইহা খুবই সাধারণ বিষয়, কিন্তু সততা, নিষ্ঠা ও শুদ্ধাচারের এই অনন্য ও বিরল উদাহরণটাই মহান হইয়া গিয়াছে। ইহা সকলের জন্যই অনুকরণীয়।
সততা, নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতার নজির স্থাপন করিবার জন্য হাবিবুর রহমানকে আমরা বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাইতে হয় ঐ জেলা প্রশাসককেও। কারণ, তিনি হাবিবুর রহমানকে অর্থ, উত্তরীয়, পোশাক-আশাক প্রভৃতি, তথা অন্য কোনো দামি উপহার দিয়াও সম্মানিত করিতে পারিতেন। কিন্তু তাহা না করিয়া বরং তিনি চালককে নিজের আসনে বসাইয়া স্বয়ং নিজেই গাড়ি চালাইয়া তাহাকে গন্তব্যে পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। সততা, কর্মনিষ্ঠাকে এইভাবে স্বীকৃতি জানানো, সম্মান প্রদর্শন করিবার মধ্যেও এক প্রকারের সততা ও মহত্ত্ব নিহিত আছে। ইহা সুবৃদ্ধির পরিচায়ক। ভালো কাজকে প্রমোট করিবার এই সদিচ্ছা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
সমাজ বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন অনেকে আছেন, যাহারা নিজের কর্ম ও দায়দায়িত্বের প্রতি যথাসাধ্য সচেতন ও সক্রিয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নানা কারণে তাহারা নিজের অবস্থানে বসিয়া ইচ্ছা থাকিলেও অনেক কিছু করিতে পারেন না! কিন্তু যাহাদের অন্তর পরিশুদ্ধ, যাহারা স্বীয় দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সৎ ও আন্তরিক, তাহারা ভালো ও ইতিবাচক কাজকে আগাইয়া লইতে সচেষ্ট হন কোনো না কোনোভাবে। মন্ত্রী-মিনিস্টার হইতে শুরু করিয়া বহু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে পাওয়া যাইবে এই তালিকায়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব সামলাইয়াছেন, কিন্তু তাহার বা তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম-অপকর্ম, দুর্নীতির রেকর্ড নাই, এমন ব্যক্তিও আছেন এই সমাজে। অন্যদিকে, ক্ষমতায় থাকাকালে 'চুরি জায়েজ'-এই ধ্যানধারণা পোষণকারী লোকের সংখ্যাও কম নাই! অথচ এই চুরির ফলে কী অনর্থ সৃষ্টি হইতে পারে, তাহার বহু নজির রহিয়াছে আমাদের চোখের সম্মুখে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে সততার অসংখ্য গল্প রহিয়াছে। সততা সর্বসমাজেই সমানভাবে সমাদৃত। সৎকর্ম, সৎ চিন্তা ও মনন সমাজকে আগাইয়া লইবার কাজকে সহজতর করিয়া তোলে। গাড়িচালক হাবিবুর রহমান ও জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলামের মতো অনেকে নীরবে- নিভৃতে এই দায়িত্বটি পালন করিয়া যাইতেছেন। এই ধরনের মহৎ কাজগুলি আমাদের আশার আলো দেখায়। জন এফ কেনেডির ভাষায়, তিনিই প্রকৃত শিক্ষিত, যিনি জ্ঞান ও সত্যের প্রচারক। সুতরাং, সকলের উচিত, সর্বদা সৎকর্মে নিবিষ্ট থাকা, সততার বাণী প্রচার করা। কেননা সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পথ।