দেশে গ্যাস চাহিদার ঘাটতি ৪০ শতাংশ

দেশে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি চলছে প্রায় দেড় দশক ধরে। পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইনের কারণে শীতকালে নিত্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিটির জোগানে পড়ে আরও টান। এই ঘাটতির মধ্যেই একটি এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস বিতরণ পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে অধিকাংশ বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বলছে নিভু নিভু অবস্থায়। অধিকাংশ শিল্পপূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না, স্থবির কারখানার চাকা। অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিতাস গ্যাস কোম্পানিসহ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সূত্র জানায়, শীতে দেশে গ্যাসের ঘাটতি তীব্র হয়। পাইপলাইনে কনডেনসেটসহ ময়লা জমে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়া, ডলার-সংকটে এলএনজি আমদানি করতে না পারা এবং আগের যে কোনো সময়ের চাইতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি একটি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় এই সংকট আরও বেড়েছে। পেট্রোবাংলার গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এবং খাত সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নে জানা যায়, দেশে এখন দৈনিক গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪৫০ কোটি ঘনফুট। গত প্রায় এক বছর ধরে ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাস না পাওয়ার কারণে খরচ বেড়েছে। বিকল্প হিসেবে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা সম্প্রতি উচ্চমূল্যের এলপিজি ও সিএনজি কারখানায় ব্যবহার শুরু করেছেন। আবাসিক খাতের অবস্থাও একই। রাজধানীর অনেক এলাকার বাসিন্দাদের খাবার হোটেল থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। অনেকেই আবার বাসাবাড়িতে বিকল্প হিসেবে পাইপলাইনের গ্যাস-সংযোগ থাকার পরও এলপিজি বা বোতল গ্যাস ব্যবহার করছেন। ব্যবহার করছেন ইলেকট্রিক বা কেরোসিনের চুলাও।

গ্যাসের চলমান ঘাটতির মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা টার্মিনাল গত বুধবার সকাল থেকে বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এটির রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ শেষে রবিবার (আজ) থেকে ঐ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার সারা দেশে ২৭০ কোটি ৬৪ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল থেকে এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে ৮ কোটি ৩১ লাখ ঘনফুট এবং দেশীয় খনি থেকে ১৯ কোটি ৩৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে সামিটের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট এবং পেট্রোবাংলার এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট।

কয়েক জন ব্যবসায়ী জানান, ঢাকার উত্তর অংশসহ আশুলিয়া, সাভার, জয়দেবপুর, সফিপুর, কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, টাঙ্গাইল, এলেঙ্গা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী  ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় তীব্র গ্যাস-সংকট দেখা দিয়েছে। হঠাৎ করেই এসব অঞ্চলের পোশাক কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রতি বর্গইঞ্চিতে ২-৩ পিএসআইতে নেমে এসেছে। সাধারণত জেনারেটর বা বয়লার চালানোর জন্য পোশাককারখানাগুলোয় ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস প্রয়োজন। এ চাপ ৭ থেকে ১০ পিএসআইয়ে নেমে আসায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে গ্যাসচালিত মেশিনের কারখানাগুলো। এতে শিল্পকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও নাজুক বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

আবাসিকে গ্যাস-সংকটের কারণে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ ও তাদের পরিবারগুলো। সামর্থ্যবান অনেকেই পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। এতে করে জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রাজধানীর মুগদা,  আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর, পোস্তগোলা, মহাখালী, পল্লবী, কাফরুল, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, রায়েরবাগ, গ্রিনরোড, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, রামপুরা, মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও লালবাগ এলাকার গ্রাহকরা গ্যাস-সংকটের তথ্য জানিয়েছে। ঘাটতির তথ্য জানিয়েছে চাঁদপুর ও ময়মনসিংহের গ্রাহকরাও।