একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষিত প্রার্থীরা প্রার্থিতা ফিরে পেতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে শুরু করেছেন। প্রথমদিনেই অভিযোগ, আবেদনের হিড়িক পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। পাশাপাশি আপিল করার নিয়ম জানতে ভিড় করেছেন অনেকেই। বাতিল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৮৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন ভবনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। আজ সোমবার ও আগামী কাল বুধবার পর্যন্ত এ অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা।
এদিকে, গত রবিবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে সারা দেশে বিএনপির ১৪১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বর্তমানে ১২টি আসনে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। বাছাই-৭টি আসনে দলটির প্রার্থী শূন্য হয়। আসনগুলো হলো- বগুড়া-৭, পাবনা-১, শরীতপুর-১, মানিকগঞ্জ-২, ঢাকা-১, সুনামগঞ্জ-৩, জামালপুর-৪। এর আগে মনোনয়নপত্র দাখিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের জন্য বরাদ্দকৃত পাঁচটি আসনে দলটি প্রার্থী দেয়নি। আসনগুলো হলো- কুমিল্লা-৭, লক্ষ্মীপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪, টাঙ্গাইল-৮ এবং মৌলভীবাজার-২। আর আওয়ামী লীগের ৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ বাছাইয়ে সারা দেশে ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। মোট মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল ৩ হাজার ৬৫টি। ২৯৫টি আসনে বিএনপির ৬৯৬ জন আর ২৬৪টি আসনে আওয়ামী লীগের ২৮১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, যেসব মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, সেসব প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কমিশনে আপিলের সুযোগ পাবেন। ৬, ৭, ৮ ডিসেম্বর আপিল শুনানি করে নিষ্পত্তি করবে কমিশন। আগামী ৯ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ এবং ৩০ ডিসেম্বর ভোট হবে।
গতকাল সোমবার আপিল শুরুর দিনেই আলোচিত প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মীর নাছির উদ্দীন, গোলাম মাওলা রনি, ইমরান এইচ সরকার, রেজা কিবরিয়া, হিরো আলমসহ বাছাইয়ে না টিকা ৮৪ জন প্রার্থী ইসিতে এসে আপিল করেছেন। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে মনোনয়নে বাদপড়া নেতারা আপিল করে পুনরায় তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেন।
চট্টগ্রাম-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মীর নাছির উদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাব বলে আশা করি।
পটুয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি বলেন, সামান্য ভুলের কারণে বাতিল হয়েছে। এটা বাতিলের মতো ভুল ছিল না, যেখানে ইসি থেকে ছোট ভুলের জন্য বাতিল না করার নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে আশাবাদী। কমিশনের প্রতি আস্থা আছে। আশা করি আমি নির্বাচন করার সুযোগ পাবো।
এ পর্যন্ত যারা আপিল করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর নাছিরউদ্দীন, পটুয়াখালী- ৩ আসনের গোলাম মাওলা রনি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে নবাব মোহাম্মদ শামছুল হুদা, বগুড়া-৭ খোরশেদ মিলটন, খাগড়াছড়িতে আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া, ঝিনাইদহ-১ আব্দুল ওয়াহাব, ঢাকা-২০ তমিজউদ্দিন, সাতক্ষীরা-২ মোহাম্মদ আফসার আলী, কিশোরগঞ্জ-২ মো. আখতারুজ্জামান, খুলনা-৬ এস এম শফিকুল আলম, বগুড়া-৪ মো. আশরাফুল হোসেন (হিরু আলম), সিলেট-৩ কাইয়ুম চৌধুরী, পটুয়াখালী-৩ মো. শাহাজাহান, দিনাজপুর-২ মোকাররম হোসেন, ঝিনাইদহ-২ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আব্দুল মজিদ, ঢাকা-১ খন্দকার আবু আশফাক, দিনাজপুর-৩ সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জামালপুর-৪ ফরিদুল কবির তালুকদার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ মো. তৈয়ব আলী, মাদারীপুর-৩ মো. আব্দুল খালেক, পটুয়াখালী-১ মো. সুমন সন্যামত, দিনাজপুর-১ পারভেজ হোসেন, মাদারীপুর-১ জহিরুল ইসলাম মিন্টু, ঠাকুরগাঁও-৩ এসএম খলিলুর রহমান ও জয়পুরহাট-১ আসনে মো. ফজলুর রহমান, পাবনা-৩ হাসাদুল ইসলাম, ফেনী-১ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ ড. মিজানুল হক, ময়মনসিংহ-৪ আবু সাঈদ মহিউদ্দিন, নেত্রকোনা-১ মো. রুবেল ইসলাম, ময়মনসিংহ-২ এনামুল হক খান, মানিকগঞ্জ-২ আরিফুর রহমান খান, খুলনা-২ এস এম এরশাদুজ্জামান, সিরাজগঞ্জ-৩ আইনাল হক, ঢাকা-১ আইয়ুব খান, বগুড়া-৩ আব্দুল মুহিত, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ জেসমিন নূর বেবী, রংপুর-৪ মোস্তফা সেলিম, ঢাকা-৫ সেলিম ভুঁইয়া, মৌলভীবাজার-২ মহিবুল কাদির চৌধুরী, কুমিল্লা-৩ কে এম মুজিবুল হক, মানিকগঞ্জ-১ তোজাম্মেল হক, সিলেট-৫ ফয়েজুল মনির চৌধুরী, সাতক্ষীরা-১ মুজিবুর রহমান, হবিগঞ্জ-২ মোঃ জাকির হোসেন প্রমুখ। এক শতাংশ ভোটার না থাকা, লাভজনক পদে থাকা, হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, আয়কর রিটার্ন দাখিল না করা, ঋণখেলাপি ও দণ্ডপ্রাপ্তসহ বিভিন্ন কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে আপিল করতে ইসিতে এসে বগুড়া-৪ আসনে আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন ওরফে হিরো আলম বলেছেন ভিন্ন কথা। মনোনয়নপত্রে কোনো ভুল না থাকার পরও ষড়যন্ত্র করে তাকে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জিরো থেকে হিরো হয়েছি। ষড়যন্ত্র করে আমাকে থামানোর চেষ্টা চলছে। আপিল না করলেও এ বিষয়ে তথ্য নিতে সোমবার কমিশনে এসেছিলেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যে অজুহাতে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, তাতে মনে হয় না কারও মনোনয়নপত্র টিকবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, তাদের সবার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বিভিন্ন অজুহাতে। জামালপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ফরিদুল হক খানের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে ইসির কাছে আবেদন করেছেন সংক্ষুব্ধ এক ব্যক্তি। গতকাল মুস্তাফিজুর রহমান নামের ওই ব্যক্তি সিইসির কাছে এ আবেদন করেন।
ছয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন চেয়েছে ইসি
মনোনয়নপত্র জমা না নেওয়ার অভিযোগে ছয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারা হলেন-ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, রংপুর, সাতক্ষীরা ও টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক (ডিসি)। তারা সকলেই এ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা। পৃথক সাতজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইসি তাদের প্রতিবেদন দিতে বলেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন মোহাম্মদ কাজী জাহাঙ্গীর। তার অভিযোগ, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন গত ২৮ নভেম্বর বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটে তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলেও তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়নি। বিষয়টি জানিয়ে প্র্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বরাবর আবেদন জানান তিনি। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দিতে বলেছে ইসি। রংপুর-৫ আসনের প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ না করায় সিইসি বরাবর আবেদন করেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনটি সংযুক্ত করে রংপুর জেলার রিটার্নিং অফিসারকে কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে। সাতক্ষীরা-৩ আসনে প্রার্থী আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ গত ১ লা ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করার বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। টাঙ্গাইল-৩ আসনের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম গত ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করার বিষয়ে ইসিতে অভিযোগ দনে। ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী মো. সাদাকাত খান ফাক্কুও মনোনয়নপত্র গ্রহণ না করার বিষয়ে অভিযোগ করেন। নরসিংদী তিন আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল লতিফও মনোনয়নপত্র গ্রহণ না করার বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করেন গত ২৯ নভেম্বর। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়। গতকাল সন্ধ্যা ৫টার মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য বলা হয়। অধিকাংশ রিটার্নিং অফিসার প্রতিবেদন পাঠিয়ে বলেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা না আসায় মনোনয়ন জমা নেওয়া সম্ভব হয়নি।