সিভিক স্পেস বা জনপরিসরের ধারণা

আমরা 'সিভিক স্পেস' বা জনপরিসরকে দেখি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, সংগঠন এবং সভা করতে পারে। এটি  আমাদের নাগরিক অধিকারের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, নাগরিক অধিকার এবং সিভিক স্পেস নানা উপায়ে সংকুচিত হয়েছে। বিষয়টি কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করে ব্যাখ্যা করছি—

মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা: মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বিশেষত, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) এবং সাইবার ক্রাইম অ্যাক্টের আওতায় সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ব্লগার বা লেখকরাও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিন্নমত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না।

সভা সংগঠন করায় বাধা: সংগঠন গঠনে বাধা, রেজিস্ট্রেশন না দেওয়া, এবং সভা করতে অনুমতি না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এগুলো সরাসরি সিভিক স্পেসের অধিকার লঙ্ঘন করছে।

তথ্য অধিকার লঙ্ঘন: সরকারি দপ্তরে তথ্যের জন্য আবেদন করলে অনেক সময় বলা হয়, এটি সুরক্ষিত তথ্য বা অন্য কোনো আইনের আওতায় পড়ে, যা সিভিক স্পেসের ওপর প্রভাব ফেলে। সেক্ষেত্রে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করে তথ্য চাইতে হয়েছে। অথচ সাধারণ সকল তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত।

সেন্সরশিপ কনটেন্ট ব্লকিং: অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করা, ভিডিও বা ডকুমেন্ট নিষিদ্ধ করা, এবং এমনকি নির্দিষ্ট বই প্রকাশে বাধা দেওয়াও সিভিক স্পেসকে সংকুচিত করছে। আমরা দেখেছি, বইমেলায় প্রকাশিতব্য বই ব্যান করা হয়েছে। প্রকাশনীকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি: সাংবাদিক বা অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার ঘটনা ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কারোর মানহানি করা, কারোর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কিংবা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করাও সিভিক স্পেসের আচরণের লঙ্ঘন। আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এই কাজে জড়িত ছিলেন কিংবা মদদ দিয়েছেন।

বর্তমান যুগে ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল স্পেসকেও সিভিক স্পেসের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য ভাগাভাগি, এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত। বলা যেতে পারে, বাস্তব জীবনের জনপরিসর এবং ডিজিটাল মাধ্যম এখন একাকার হয়ে গেছে। অর্থাৎ যেখানেই আমরা মত প্রকাশ করছি না কেন, সেটিই সিভিক স্পেস। আর সত্যিকার অর্থে আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই এখন বেশি মত প্রকাশ করি, আলোচনা করি। ফলে সেখানে কী ঘটছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, সিভিক স্পেস ব্যবহারে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও এটি কখনোই অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার হাতিয়ার হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ—

ভুয়া তথ্য গুজব: ভুল তথ্য বা গুজব ছড়ানো মত প্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহার। এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা যেকোনো সংঘর্ষের কারণ হতে পারে।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা: মত প্রকাশের সময় অন্যের গোপনীয়তা ভঙ্গ করা বা অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয়।

আদর্শ সিভিক স্পেসের উদাহরণ: নরওয়ে, সুইডেন, এবং ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে সিভিক স্পেসের যথাযথ চর্চা দেখা যায়। সেখানে মানবাধিকার, দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা হয়।

বাংলাদেশে সিভিক স্পেস এখনও একটি স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষত, জুলাই আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আনে সিভিক স্পেসের গুরুত্ব। সেসব আন্দোলনে নিহত এবং আহতদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। বৈষম্যবিরোধী চেতনা এবং সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সিভিক স্পেস রক্ষা করা জরুরি।

আমরা প্রত্যাশা করি এমন একটি জনপরিসর, যেখানে মানুষ কোনো প্রকার বাধাবিঘ্ন ছাড়া স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সুযোগ এসেছে। জনপরিসরে যেন অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণের খড়্গ নেমে না আসে, সে বিষয়ে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। তবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও সামাজিক রীতিনীতি, প্রচলিত আইন ও ধর্ম-বর্ণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সচেতন ও সহনশীল আচরণ করতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। আর নাগরিকদেরও উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং সিভিক স্পেস ব্যবহারে সতর্ক থাকা। এভাবেই একটি গণতান্ত্রিক, সাম্যের সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।