মানুষ প্রতিদিন বহু বস্তু ব্যবহার করে; কিন্তু সকল কিছু সমানভাবে পরীক্ষা করিয়া দেখে না। দেখা সম্ভবও নহে। বাজারে বিক্রীত প্রতিটি ঔষধ, প্রতিটি খাদ্যপণ্য, প্রতিটি প্রসাধনী কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর নিরাপত্তা নিজে যাচাই করিবার ক্ষমতা কোনো সাধারণ মানুষের নাই। সভ্যসমাজে এই কারণেই রাষ্ট্রের জন্ম। রাষ্ট্র কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে না, মানুষের অদৃশ্য নিরাপত্তারও প্রহরী হইয়া দাঁড়ায়। যেই পণ্য মানুষের ঘরে প্রবেশের অনুমতি পায়, রাষ্ট্র পরোক্ষভাবে তাহার নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই বিশ্বাসের উপরই ভোক্তাসমাজ দাঁড়াইয়া থাকে। তবে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরিবার কোনো সুযোগ নাই। সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডিও) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় প্রকাশ পাইয়াছে, পরীক্ষিত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রহিয়াছে। শিশুদের জন্য প্রস্তুত টুথপেস্টেও এই কণা শনাক্ত হইয়াছে। গবেষণায় আরো বলা হইয়াছে, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য মাত্ৰা নির্ধারণের কোনো জাতীয় মানদণ্ড নাই; নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল একটি রাসায়নিকের নহে, একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থারও।
টুথপেস্ট এমন একটি দ্রব্য, যাহা মানুষ প্রতিদিনই ব্যবহার করে। শিশুরা দাঁত মাজিবার সময় অনেক ক্ষেত্রে ফেনা গিলিয়া ফেলে। এই বাস্তবতার পরও যদি এমন পণ্যের উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকে, যদি লেবেলে ব্যবহৃত উপকরণের পূর্ণ বিবরণ বাধ্যতামূলক না হয়, যদি বাজারে বিক্রীত পণ্যের নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা না চলে, তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবেই—ভোক্তার নিরাপত্তার দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করিবে? এই প্রশ্ন কেবল টুথপেস্টকে ঘিরিয়া সীমাবদ্ধ নহে। ইহা আমাদের নিয়ন্ত্রককাঠামোর প্রকৃতি লইয়াও প্রশ্ন তোলে। কোনো পণ্য বাজারে আসিবার পূর্বে তাহার নিরাপত্তা কতখানি যাচাই করা হয়? অনুমোদনের পরে কতবার তাহা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়? নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশিত হইলে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা কত দ্রুত পরিবর্তিত হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর যত অস্পষ্ট থাকে, নাগরিকের উদ্বেগও তত বৃদ্ধি পায়।
আধুনিক রাষ্ট্রে ভোক্তা-নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনিক কাজ নহে—ইহা জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বের বহু দেশে ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কারণ, বিজ্ঞান যত অগ্রসর হয়, ততই নতুন ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হয়। নীতিনির্ধারণের দায়িত্বও সেই জ্ঞানকে অনুসরণ করা। বিজ্ঞান গবেষণাগারে আবিষ্কার করে; রাষ্ট্র সেই আবিষ্কারকে জননীতিতে রূপ দেয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিলে গবেষণা কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু ঝুঁকি মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। এই গবেষণার আর একটি তাৎপর্য উপেক্ষা করা চলে না। জরিপে অংশগ্রহণকারী বহু ভোক্তা জানিতেনই না যে, মৌখিক পরিচর্যার পণ্যে প্লাস্টিকজাত উপাদান থাকিতে পারে। আবার পরীক্ষণভুক্ত কোনো টুথপেস্টের মোড়কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বা সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম পলিমারের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। তথ্য গোপন থাকিলে সচেতন ভোক্তা হওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়। ভোক্তার স্বাধীনতা তখন কেবল নামমাত্র স্বাধীনতা; কারণ তথ্যহীন মানুষের পক্ষে বিচক্ষণ নির্বাচন করা সম্ভব নহে।
অতএব, প্রয়োজন কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নহে। প্রয়োজন বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে সুস্পষ্ট মানদণ্ড প্রণয়ন, বাধ্যতামূলক উপাদান-তালিকা, নিয়মিত বাজার তদারকি, আধুনিক পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতিমালার ধারাবাহিক হালনাগাদ। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব আছে; কিন্তু সেই দায়িত্ব কার্যকর হয় তখনই, যখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ হয়। মানুষ প্রতিদিন যাহা অন্ধ বিশ্বাসে ব্যবহার করে—সেই সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতেই হইবে। কারণ, ভোক্তার আস্থা একবার ক্ষুণ্ন হইলে তাহা পুনর্গঠন করিতে দীর্ঘ সময় লাগে। সমাজ-রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও অনেকখানি সেই আস্থার উপরই প্রতিষ্ঠিত। এই বিশ্বাস নষ্ট করিবার কোনো সুযোগ নাই।

