মানুষের অন্যতম প্রধান চাওয়া ভয়ভীতিহীন পরিবেশ। মানুষ সর্বদা তাহার নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি চাহে। এই নিশ্চয়তা পাইলে তাহার মৌলিক অধিকার যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদির ব্যবস্থা সে অনেকটা নিজেই করিয়া লইতে পারে। এই একটিমাত্র চাওয়া পূরণ হইলে এই পৃথিবী আর পৃথিবী থাকিত না। পরিণত হইত স্বর্গ ও শান্তিময় স্থানে। এই জন্য গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত হইল 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার' তথা ভয় হইতে মুক্তি। ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তাহার স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে যে 'ফোর ফ্রিডমস' বা চারটি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন, তাহার অন্যতম 'ভয় হইতে মুক্তি'। এই জন্য ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেওয়া হয়, সেইখানে এই 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার'-এর কথাও বলা হয়; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে এমন পরিবেশের দেখা পাওয়া যেন কল্পনাতীত।
একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই সেই দেশের এক নম্বর চেয়ারে বসিতে চাহেন না। যাহারা চাহেন তাহাদের কথা আলাদা: কিন্তু যাহারা তাহা চাহেন না, তাহারা ইহা অবশ্যই চাহেন যাহাতে তাহারা ভয়ভীতিহীন পরিবেশে বসবাস করিতে পারেন। এই বিষয়টি জড়িত সুশাসনের সহিত, আইনের শাসনের সহিত। বিশেষ করিয়া সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় নহে, যাহাতে কোনো না কোনোভাবে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। ইহাতে ব্যবসায়- বাণিজ্যসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও চলাফেরা ব্যাহত হইতে বাধ্য। ফ্রিডম অব মুভমেন্ট বা চলাফেরার স্বাধীনতাও গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। মানুষ যখন দেখেন, কাহারো কাহারো বিরুদ্ধে নির্বিচারে, বাছবিচারহীন, মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হইতেছে, তখন তাহাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। তাহারাই যখন আবার ক্ষমতায় ফিরিয়া আসেন এবং একের পর এক বেকসুর খালাস পাইয়া যান, তখনো তাহাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। তাহা হইলে বড় প্রশ্ন, এমন প্রশ্নবিদ্ধ কাজ আমরা কেন করি? ইহাতেও সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে তৈরি হয় ভীতিকর পরিবেশ ও পরিস্থিতি।
ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়া কোনো কিছু পরিচালনা করা যুক্তিসংগত নহে। ত্রাস সৃষ্টি করিলে সেই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বয়স ৬০/৭০ বৎসর হইয়া গিয়াছে; কিন্তু তাহারা এখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ লাভ করিতেছে না। কেহ চুরি বা কোনো অন্যায়-অপকর্ম করিলে তাহার বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা হওয়া প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা লওয়াটাই কাম্য; কিন্তু যাহারা অতীতে এমন মামলায় গ্রেফতার হইয়াছেন বা জেল খাটিয়াছেন, তাহারাই যখন জাতিকে নসিহত দিতে শুরু করেন, তখন সাধারণ মানুষের কেমন লাগে? ইহার কি কোনো যুক্তিসংগত জওয়াব আছে? আমরা চোর ও দুর্বৃত্তদের সমর্থন করি না: কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতিকে তাহারা উপদেশ দিতে থাকিবেন, এমনটি কেহই কামনা করেন না। কেননা ইহাতেও সাধারণ মানুষ প্রকারান্তরে ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন।
ভয় তথা ভয়ের পরিবেশ যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির প্রতিবন্ধক। ইহার মধ্যে সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকিবার কথা চিন্তা করা যায় না। শুধু নির্বাচনের সময় নহে, সমগ্র বৎসরই উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতির একটা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে মামলা-হামলার মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। এইভাবে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা যে বিনষ্ট হয়, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।