বিশ্বব্যাপী নিত্যনতুন ভাইরাসের আবির্ভাব জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে । আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হইলেও, ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করিতে বিশ্বব্যাপী এক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গতকাল বাংলাদেশে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি)- এর সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় জনমনে একপ্রকার শঙ্কা দেখা দিয়াছে। তবে, বিশেষজ্ঞগণ আশ্বস্ত করিয়াছেন যে, এইচএমপিভি নূতন কোনো ভাইরাস নহে এবং ইহার প্রভাব কোভিড-১৯-এর ন্যায় ভয়াবহ হইবার আশঙ্কা কম । তথাপি এই ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এইচএমপিভি প্রথম শনাক্ত হইয়াছিল ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুসারে, ইহা একটি আরএনএ ভাইরাস, যাহা প্রধানত শাসনতন্ত্রে আক্রমণ করে। যদিও ইহা কোভিড-১৯-এর সহোদর ভাইরাস নহে, তথাপি ইহার সংক্রমণের ধরন ও উপসর্গ কিছুটা একইরূপ। সর্দি, জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি সাধারণ ঠান্ডাজনিত লক্ষণ লইয়া শুরু হইলেও, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া কিংবা অ্যাজমার মতো জটিল অবস্থার সৃষ্টি হইতে পারে। বিশেষত শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাহাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাহাদের জন্য ইহা অধিকতর বিপজ্জনক হইতে পারে । বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ এবং সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)- এর পক্ষ হইতে জানানো হইয়াছে যে, বর্তমানে এই ভাইরাস লইয়া আতঙ্কিত হইবার কোনো কারণ নাই। ইহা শীতকালীন একটি স্বাভাবিক সংক্রমণ এবং পূর্বেও বাংলাদেশে ইহার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছে । ২০১৬ বা ২০১৭ সালের দিকেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হইয়াছিল । অতএব, ইহার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বিদ্যমান ।
তবে, ইহা হইতে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকিবার কোনো অবকাশ নাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসি সতর্ক করিয়াছেন যে, এইচএমপিভি সংক্রমিত ব্যক্তি হাঁচি, কাশি কিংবা সংক্রমিত বস্তু স্পর্শ করিয়া সহজেই অন্য ব্যক্তিতে ছড়াইতে পারে। যেই হেতু ইহার কোনো কার্যকর টিকা এখনো উদ্ভাবিত হয় নাই, সেই হেতু কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গৃহীত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখানে কার্যকর হইতে পারে । এই প্রসঙ্গে যাহা করণীয়, তাহা হইল : জনসমাগম এড়াইয়া চলা ও সর্বদা মাস্ক ব্যবহার করা, বারংবার সাবান ও পানি দ্বারা হাত ধৌত করা, হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় মুখ ঢাকিয়া রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তির নিকট সংস্পর্শ এড়াইয়া চলা, পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি মনোযোগ দেওয়া ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞগণ বারংবার সতর্ক করিতেছেন যে, ভবিষ্যতে নূতন নূতন রোগজীবাণুর প্রাদুর্ভাব ঘটিতে পারে। বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বিল গেটস একাধিকবার সতর্ক করিয়াছেন যে, আগামী ২৫ বৎসরের মধ্যে নূতন মহামারি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রহিয়াছে। কোভিড-১৯ আমাদের শিখাইয়াছে, ভাইরাস প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে এইচএমপিভি নূতন কোনো মহামারি সৃষ্টি করিবে বলিয়া শঙ্কা না থাকিলেও, ইহার বিরুদ্ধে অবহেলা প্রদর্শন হইবে আত্মঘাতী। কাজেই, আমাদের সজাগ ও প্রস্তুত থাকিতে হইবে । বাংলাদেশের জনগণের জন্য এইচএমপিভি একটি নূতন অভিজ্ঞতা নহে বটে, তবে ইহা লইয়া উদাসীন হওয়া হইবে আত্মঘাতী। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নত করিতে হইবে এবং গবেষণায় অধিকতর বিনিয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে। বিশেষত, শীতকালে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়িতে পারে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ সতর্ক করিয়াছেন ।
সর্বোপরি, যে কোনো রোগ হইতে রক্ষা পাইবার মূল চাবিকাঠি হইল সচেতনতা । কোভিড-১৯ আমাদের শিখাইয়াছে, আগাম প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলাই বড় দুর্যোগ হইতে রক্ষা করিতে পারে। অতএব, এইচএমপিভি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি পালনে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন । তাহা হইলেই আমরা একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়িয়া তুলিতে সক্ষম হইব । সতর্ক থাকাই হইল সঠিক পথে অগ্রসর হইবার প্রথম পদক্ষেপ ।