অঝোর বারিপাত আর বন্যার পদধ্বনিতে বিদায় ?নিল আষাঢ়। আকাশে সজল সঘন মেঘমালা আর বৃষ্টির দাপটের সঙ্গে তিস্তা-ব্র্রহ্মপুত্র অববাহিকার জনপদে বানভাসিদের দুর্ভোগকে সারথি করে প্রকৃতিতে আজ শ্রাবণ এলো। বর্ষারই সহোদর শ্রাবণ। নদী-নালা-খাল-বিল-প্রান্তর-জলাশয় পানিতে টইটম্বুর করছে এখন। বারো মাসের মধ্যে শ্রাবণ প্রাণে-মনে-প্রকৃতিতে ছড়ায় আলাদা দ্যোতনা। বৃক্ষ-লতা-পাতাগুল্ম চকচকে বৈভবে সতেজ হয়ে ওঠে। শ্রাবণের বৃষ্টির ছোঁয়ায় কদম, হিজল, কেয়া ও যূথিকা ফুল ফুটবে। শাপলার ঐশ্বর্য নয়নাভিরাম হয়ে উঠবে। আম, কাঁঠাল, আনারসের সঙ্গে আমড়া, লটকন, পেয়ারা, করমচা, জাম্বুরা, কামরাঙাসহ অসংখ্য দেশীয় ফলের সমারোহে ভরে উঠবে। বর্ষণমুখর শ্রাবণে ব্যস্ত উদয়াস্ত কাটাতে হবে কৃষকদের। আমন ধান রোপণ, পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো শুরু হয়েছে।
খনার বচন বলে :‘শ্রাবণের পুরো, ভাদ্রের বারো/ ধান্য রোপণ যত পারো’, ‘আষাঢ় কাড়ান নামকে/ শ্রাবণে কাড়ান ধানকে’, ‘পান পুঁড়লে শ্রাবণে/ খেয়ে না ফুরায় বারণে..।’
বাংলা সাহিত্যের বড়ো অংশ শ্রাবণের অধিকারে। এ মাস যেন বিরহকাল। স্বর্ণকুমারী দেবী শ্রাবণবন্দনায় বলেছেন— ‘সখি, নব শ্রাবণ মাস/ জলদ-ঘনঘটা, দিবসে সাঁঝছটা/ ঝুপ ঝুপ ঝরিছে আকাশ!/ ঝিমকি ঝম ঝম, নিনাদ মনোরম,/ মুহুর্মুহু দামিনী-আভাস! পবনে বহে মাতি, তুহিন-কণাভাতি/ দিকে দিকে রজত উচ্ছ্বাস।’ প্রেম-বিরহতাড়িত কবি-সাহিত্যিকরা কোমল করে নাম দিয়েছেন ‘শাওন’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা আর মান্না দের কণ্ঠে শ্রাবণ যেন জীবন্ত হয়ে আছে— ‘শাওন রাতে যদি/ স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে/ নয়নে বারি ঝরে...।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মাসকে নিয়ে শিহরিত হয়েছেন :‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে/ দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে,/ ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে/ ধরিত্রী তার অঙ্গনেতে নাচের তালে ওঠে মেতে,/ পুব-হাওয়া ধায় আকাশতলে, তার সাথে মোর ভাবনা চলে/ কালহারা কোন্ কালের পানে ছুটে...।’ ভানুসিংহ ঠাকুরের কণ্ঠে বিরহকাতরতা : সজনি গো, শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা/ নিশীথযামিনী রে। কুঞ্জপথে সখি, কৈসে যাওব অবলা কামিনী রে। উন্মদ পবনে যমুনা তর্জিত, ঘন ঘন গর্জিত মেহ। দমকত বিদ্যুত্, পথতরু লুণ্ঠত, থরহর কম্পত দে...। বর্ষামঙ্গলের কবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ শ্রাবণরাগে ভেসে গেছে। ‘প্রাণ তার অদূরে উদ্যত শ্রাবণে/ যদি- না জলধরে বাহন করে আমি পাঠাই মঙ্গলবার্তা?/ যক্ষ অতএব কুরচি ফুল দিয়ে সাজিয়ে প্রণয়ের অর্ঘ্য/ স্বাগত-স্বভাষ জানালে মেঘবরে মোহন, প্রীতিময় বচনে।’
প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ শ্রাবণের বর্ষাকে বলেছেন বিরহ রোদন। ‘বাংলার শ্রাবণের বিস্মিত আকাশ চেয়ে রবে/ ভিজে পেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে/ শোনাবে লক্ষ্মীর গল্প—ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনে...।’ শ্রাবণের পর কাশফুলের শুভ্রতা ছড়িয়ে প্রকৃতিতে আসবে শারদীয় শরত্।