বিপিএল চলবে আর তার সঙ্গে বিতর্ক হবে না, এমনটি যেন হতেই পারে না। প্রায় প্রতি আসরেই কোনো না কোনো কিছু নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনা, অসন্তোষ, ক্ষোভ থাকবেই। এটা নতুন নয়। দেশের ক্রিকেটে এই টুর্নামেন্টটির জন্মলগ্ন থেকেই এমনটি দেখা যাচ্ছে। তবে এবার খানিকটা ভিন্ন করার প্রত্যাশা দেখিয়েছিল বিসিবি। বোর্ডের পক্ষ থেকে বিপিএলের চলমান আসর নিয়ে পরিকল্পনার শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, এবারের আসর হবে আগের সব আসরের চেয়ে ব্যতিক্রম।
তবে হয়নি তেমনটি, যদিও মাঠের খেলায় খানিকটা স্বস্তি ছিল, তবে বাইরে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্কের কমতি ছিল না। সম্প্রতি সব থেকে বেশি খেলোয়াড়দের পেমেন্ট ঝুলে থাকার বিষয়টি সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। দুর্বার রাজশাহীর ক্রিকেটাররা অনুশীলন বয়কটের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাতে টুর্নামেন্টের শুরুতে ঢাকায় ওঠা এই আলোচনা আবার চট্টগ্রামে এসে গাঢ় হয়ে প্রকাশ্যে আসে। তবে পাওনা টাকা নিয়ে জটিলতা কি শুধু এক দলেরই? অবশ্যই নয়। এবারের আসরের বেশির ভাগ ফ্রাঞ্চাইজিই একই পথে হাঁটছে। একের পর এক ম্যাচ খেলে গেলেও ফ্রাঞ্চাইজির কাছে ঝুলে রয়েছে খেলোয়াড়দের পাওনা টাকা।
গেল বুধবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল দুর্বার রাজশাহীর। তবে নির্ধারিত সময়ের খানিকক্ষণ আগে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা অনুশীলন করবে না। জানা যায়, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর থেকে পাওনা টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরও খেলোয়াড়দের টাকা দিচ্ছিল না ফ্রাঞ্চাইজিটি তাই অনুশীলন বয়কট করেন খেলোয়াড়রা। যদিও ফ্রাঞ্চাইজির দাবি, অনুশীলন বয়কটের খবর সঠিক নয়। সব খেলোয়াড় তখনো চট্টগ্রামে। টিম হোটেলে না ওঠায় টিম ম্যানেজমেন্টই সেদিন দলকে বিশ্রাম দিয়েছিল।
পরে এমন ঘটনায় বিসিবি প্রধানেরও হস্তক্ষেপ করা লাগে। তারপর ভাঙে জটিলতা। কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেন, পাওনা টাকা ৫০ শতাংশ পরিশোধ করার। তাতে পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হয় খেলোয়াড়রা ফেরেন মাঠে। গতকাল ম্যাচও খেলেছেন। অবশ্য তার আগে গত পরশু মালিকপক্ষ ২৫ শতাংশ নগদ অর্থ ক্রিকেটারদের দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দলের ক্রিকেটাররা। আর বাকি ২৫ শতাংশ অর্থের চেক প্রদান করার আশ্বাস দেন যেখান থেকে আগামীকাল টাকা পাবে তারা। ম্যাচ শেষে টাকা পাওয়ার বিষয়ে দলের অলরাউন্ডার সানজামুল ইসলাম বলেন, 'যেটা কথা ছিল, কর্তৃপক্ষ যেটা বলেছিল সেটা তারা দিয়েছেন। পুরো দলকেই দিয়েছেন।'
পরে এ বিষয়ে বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেন, 'গণমাধ্যমের মাধ্যমেই রাজশাহীর এই পেমেন্ট জটিলতা নজরে এসেছে আমাদের। তারপর এটা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাদের (মালিক কর্তৃপক্ষ) আমরা বোঝাতে পেরেছি। তারাও পেমেন্ট শুরু করেছে। তাতে আজ (গতকাল) মাঠেও দলটি বেশ উজ্জীবিত ছিল। ভালো খেলেছে এবং জিতেছে। আশা করব, তারা (ফ্রাঞ্চাইজি) নিজেদের দায়িত্বে আরো সচেতন হবেন এবং পেমেন্টটা এমন ধারাবাহিক রাখবেন।'
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে, শুধু রাজশাহী নয়, খেলোয়াড়দের পেমেন্ট নিয়ে তালবাহানা করছে আরো কয়েকটি ফ্রাঞ্চাইজিও। কয়েকটি ফ্রাঞ্চাইজি ২৫ শতাংশ টাকা পরিশোধ করেছেন, কয়েকটি করেছেন ৪০-৫০ শতাংশ। আবার অনেকে টাকাই এখনো পায়নি। যেখানে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে পেমেন্ট নিয়ে বিসিবি যে নিয়ম করা হয়েছিল সে অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের ৫০ শতাংশ অর্থ দিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। টুর্নামেন্ট চলাকালীন বাকি ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাকি ২৫ শতাংশ অর্থ দেওয়ার কথা টুর্নামেন্ট শেষে।
তবে টুর্নামেন্টের অর্ধেক শেষ হয়ে গেলেও নিয়ম পালন না করে বোর্ডের সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে ফ্রাঞ্চাইজিরা। দলগুলোর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রংপুর রাইডার্স ও সিলেট স্টাইকার্স ২৫ শতাংশ করে টাকা দিয়েছে। ফরচুন বরিশালও করেছে একই কাজ। চিটাগং কিংসের কেউ কিছু পেয়েছেন, কেউ কিছুই পাননি। কিন্তু আসরে সবচেয়ে ধুঁকতে থাকা দল ঢাকা ক্যাপিটালসের খেলোয়াড়রা ৫০ শতাংশ টাকা পেয়েছেন। তবে রাজশাহী বাদে কেউই পেমেন্ট পাওনা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি এখনো।
এ প্রসঙ্গে ফাহিম জানান, তিনি কিছুই জানেন না। বলেন, 'সত্য বলতে আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। রাজশাহীরটা কানে এসেছে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে কিছু কাজ করতে পেরেছি। অন্যদেরটা আসলেও সমাধানের চেষ্টা করব।'
এ সময় ফ্রাঞ্চাইজিগুলো পেমেন্ট নিয়ে এমন তালবাহানায় তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে জানিয়ে এই বোর্ড পরিচালক আরও বলেন, 'এ সব কারণ নিয়ে আমরা বিব্রত। শুধু ক্রিকেট বোর্ড নয়, ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত সবাই এ জিনিসটায় বিব্রত। এগুলো আমাদের সবার জন্যই শিক্ষা। পরবর্তী সময় এমন ভাবেই আগাব যাতে এ বিষয়গুলো না হয়। অনেক কাজ আমাদের আগেই করা উচিত ছিল, যেগুলো আমরা সম্ভবত করিনি।'