নাসরীন মুস্তাফা
বুড়োটার সামনে বিশ বছর পর দাঁড়াতে হলো তাকে। ঘোলাটে চোখে ছানি পড়েছে বলে বুড়োটা তাকে দেখতে পারছে না। কাঁপা কাঁপা গলায় জানাল, চিনতেও পারছে না। চিনিয়ে দিতে হবে বলে বিশ বছর পর নিজেকে চেনানো শুরু করল সে। বলল, তার দুটো হাত আছে, দুটো পা আছে। গোলগাল মুখ। চুলগুলো পুরো কালো নয়, খানিকটা বাদামি। চোখের রংও সেরকম। বিশ বছর আগে তাই এই বুড়োটাই দিয়েছিল তার নাম ‘বিলাতি’।
বিলাতি, বিলাতি... হাতে ধরা তজবিহ্র দানা টিপতে টিপতে বুড়োটা জপ করে। যদি মনে পড়ে, তাই হয়তো বা। ছানি পড়া আঁধারে ছুটে চলে শত শত শিশু, সদ্য কিশোর। মক্তব চত্বরে বহুকাল আগে যারা ছুটে চলত, তারাও এসে যায় আচানক। বিলাতির ধ্বনিতে রং চড়িয়ে কোনো এক কিশোরের আকার নেবে কি নেবে না, এই সংশয় ঘিরে ধরে বুড়োকে। বলে, বুড়ো হয়ে গেছি তো! মনে নেই কতো কিছু।
মনে করানোর যুদ্ধ থামাবে না সে। আর তাই তুলে আনে স্মৃতি থেকে বিশ বছর আগেকার কোনো এক সুবহে সাদিকের খুঁটিনাটি সব। দশ বছরের শিশুর শরীরে অগত্যা ঢুকতে হয় তাকে, যার তীব্র যন্ত্রণা পায়ুপথ হয়ে পানিপথের যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিল বুড়োটা, বিশ বছর আগে যে কি না ছিল ঠিক মধ্যবর্তী বয়সে। বজ্রবৃষ্টির মতো ‘বিলাতি’ এক পুতুলের কথা মনে আসে কি আসে না, স্মৃতির তরকারি ঠান্ডা, ঠান্ডা শরীরের পাতিলও। আর তাই বুড়োটা তজবিহেত আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে টের পায়, সামনে দাঁড়ানো বাঘটার দুই চোখে জ্বলে তজবিহ্র পুঁতি, শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে কেমন স্থির হয়ে যায় তারা।
সুবহে সাদিকে রং ছড়ায় তখন আজানের আহ্বান—নামাজের জন্য এসো। কল্যাণের জন্য এসো।