গার্মেন্টস মালিকদের টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি ফ্যাশন (বিইউএফটি)। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের থাকার কথা থাকলেও এখনো এটি দখল করে রেখেছে একটি গোষ্ঠী! বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এর মাধ্যমে নিজেদের কব্জায় নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির মালিকানা এখনো সংগঠনটিকে ফেরত দেয়া হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট বিজিএমইএর বোর্ড ভেঙ্গে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও বিইউএফটি চালাচ্ছেন আগের ট্রাষ্টিরা। তারা সবাই পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রভাবশালী সদস্য।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ তাগিদ থেকে ১৯৯৯ সালে বিজিএমইএর তৎকালীন সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহা এ খাতের জন্য একটি ইনস্টিটিউট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। এ তাগিদ থেকে সে বছর উত্তরাতে একটি ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে ইনস্টিটিউটটি চালু করা হয়। প্রথম দিকে বিভিন্ন কারাখানা মালিক এ প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের মেশিনপত্র সরবরাহ করেন। পোশাক খাতের বড় উদ্যোক্তা হারুন অর রশিদকে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। স্টকল্যান্ডের একজন ফ্যাশন ডিজাইনার প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাকালীন সময় বলা হয়েছিলো, বিজিএমইএতে যখন যারা নেতৃত্বে আসবেন তারাই এ প্রতিষ্ঠানের ট্রাষ্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু সে সময়কার একটি প্রভাবশালী মহল এ সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে নিজেরাই ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য হয়ে যান। রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১ সালে বিজিএমইএকে না জানিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে ৯ জন ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য হন। এরা হলেন- মুজাফফর উদ্দিন সিদ্দিক (চেয়ারম্যান), আব্দুস সালম মুর্শেদী, টিপু মুন্সি, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন), ফারুক হাসান, সিদ্দিকুর রহমান, এস এম মান্নান (কচি) রিয়াজ-বিন-মাহমুদ।
পরবর্তীকালে ট্রাষ্টি বোর্ডে আরো ১২ জনকে যুক্ত করা হয়। এরা হলেন- সালাহউদ্দিন আহমেদ, মো. আতিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির, কুতুবুদ্দিন আহমেদ, আরশাদ জামাল (দিপু), খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, মশিউল আযম (সজল), রফিকুল ইসলাম, মো. মহিদুল ইসলাম খান, মো. সাজ্জাদুর রহমান মৃধা, মো. জাকির হোসেন ও আবদুল্লাহ হিল রাকিব। বিইউএফটি পরিচালনায় এদের সমন্বয়ে যে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে তা সোসাইটি রেজিস্টেশন অ্যাক্ট-১৮৬০ অনুযায়ী রেজিস্টেশন করা।
বিজিএমইএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে যখন যারা আসবেন তারা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হবেন। কিন্তু বিইউএফটিতে বিজিএমইএর মালিকানার কোনো অস্তিত্ব নেই। যে কারণে গত কয়েক বছর ধরে সংশ্লিষ্টরা বিইউএফটির আয়-ব্যয় কিংবা অন্যান্য বিষয়াদির বিষয়ে বিজিএমইএ-কে অবহিতও করেন না। এ বিষয়ে বিজিএমইএর প্রশাসক মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি খুব বেশি সময় হয়নি। এই অল্প সময়ে বিষয়টির সুরাহা করা যাবে না। তিনি বলেন, আমার কাজ হচ্ছে একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরী করে নির্বাচনের মাধ্যমে যাতে একটি ভালো নেতৃত্ব আসে, তার ব্যবস্থা করে দেওয়া। নতুন নেতৃত্বই বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বিজিএমইএ নির্বাচনী বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে বিজিএমইএর তৎকালীন সেক্রেটারি এ কে এম ফজলুর রহমান বিইউএফটির রেজিস্টারের কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেন। এতে তিনি কয়েকটি বিষয়ে তথ্য জানতে চান ৷ এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিইউএফটির মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে বিইউএফটির চুক্তির কপি এবং বিইউএফটি ট্রাস্টেও সদস্যদের নামের তালিকা। অভিযোগ রয়েছে, এ চিঠি বিইউএফটিতে যাবার পর ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য বিজিএম- ইএ কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রচেষ্টা নিলে দেখে নেওয়া হবে। বিজিএমইএর একজন সাধারণ সদস্য নাম প্ৰকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাধারণ সদস্যদের চাঁদার টাকা দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এত দিন আমরা নিজেদের এ প্রতিষ্ঠানের মালিক ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি বিষয়টি উলটো।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা দেশে বিজিএমইএর সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৩১৪ জন। কারখানার মান অনুসারে প্রতি কারখানা বিজএমইএকে বছরে পাঁচ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিয়ে থাকে। মূলত এ চাঁদার টাকা দিয়েই বিইউএফটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বর্তমানে বিইউএফটির কার্যক্রম তুরাগের নিশাতনগরে নিজস্ব ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ফ্যাশন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স-এর ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি দেওয়া হয়। এছাড়া ছয় মাস, চার মাস এবং তিন মাসের বিভিন্ন শর্ট কোর্সের ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।