শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ, তাহাদের সুরক্ষা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা আমাদের সামনে এক নির্মম চিত্র উপস্থাপন করিতেছে। গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। রিপোর্টে প্রকাশিত বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, গত পাঁচ বৎসরে শিশু নির্যাতনের হার ক্রমাগত বাড়িয়াছে, যদিও কোনো কোনো বৎসরে সাময়িকভাবে হ্রাস পাইয়াছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই প্রবণতা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।
শিশুরা সমাজের সবচাইতে নিরীহ ও নিরপরাধ অংশ। তাহাদের পক্ষে কোনো প্রতিবাদ করা সম্ভব হয় না, তাহারা নীরবে নিপীড়নের শিকার হয়। অনেক সময় পরিবারের নিকটও তাহারা আপন দুর্দশার কথা বলিতে পারে না। ফলে অপরাধীরা অধিকতর সাহস পাইয়া আরো ভয়ানক অপরাধ সংঘটনে প্রবৃত্ত হয়। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, শিশু নির্যাতন শুধু কাহারো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো সমস্যা নহে, ইহা গোটা সমাজের এক গভীর ব্যাধি, যাহা অবিলম্বে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞগণ বলিয়াছেন, শিশু নির্যাতন বন্ধ করিতে হইলে কঠোর আইন প্রণয়ন করিয়া তাহার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। বাংলাদেশে শিশু অধিকার সুরক্ষা আইন, ২০১৩ থাকিলেও ইহার বাস্তবায়নে চরম শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়। অপরাধীরা প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করিয়া শাস্তি হইতে মুক্তি লাভ করে। ইহা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে যে, কোনো শিশুর প্রতি নির্যাতন বা সহিংসতা সংঘটিত হইলে তাহার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হইবে।
মনে রাখিতে হইবে, শিশু ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সমাজের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। এই ধরনের অত্যাচারের শিকার শিশুরা বড় হইবার পরও মানসিক ট্রমা হইতে সহজে মুক্তি পায় না। ইহার প্রভাব থাকে শিশুদের সারা জীবনে। দুঃখজনকভাবে, এমএসএফ, আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করিলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শিশুহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা কমিতেছেই তো না-ই, বরং ক্রমশ ভয়াবহ আকারে বাড়িতেছে। শিশু নির্যাতন রোধ করা এক দিনে সম্ভব নহে, ইহা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর কার্যক্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করিতে হইবে। পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সমাজের সচেতন অংশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশু নির্যাতন ক্রমশ কমাইয়া আনা খুব কঠিন কাজ নহে স্কুল, পরিবার ও সমাজে শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
অনেক সময় পরিবারের নিকট আত্মীয়রাও শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করিয়া থাকে, যাহা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অমানবিক। এই সকল ব্যাপারে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকিতে হইবে। তাহা ছাড়া, মিডিয়া ও সামাজিক সংগঠনগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করিতে হইবে। তাহার পাশাপাশি, শিশুদের জন্য নির্ভরযোগ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন, যাহাতে তাহারা সহজেই অভিযোগ করিতে পারে এবং নিরাপত্তা পাইতে পারে।
শিশু নির্যাতনের শান্তি কঠোর করিয়া অপরাধীদের প্রতি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বিশেষত, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা শাস্তি এড়াইয়া যাইতে পারে, যাহা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। সুতরাং শিশুদের সুরক্ষা প্রদান করিবার জন্য একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গঠন করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। শুধু আইন প্রণয়ন করিলেই চলিবে না, তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন করাটা আরো বেশি জরুরি। আধুনিক কোনো কল্যাণকর রাষ্ট্রে শিশুরা অনিরাপদ থাকিতে পারে না।