একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আমাদের নিত্যপণ্যের বাজার অনেক ক্ষেত্রে ‘প্রতারণার বাণিজ্যালয়’ হইয়া উঠিয়াছে। বিগত কয়েক যুগের মূল্য-পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, এইখানকার বাজারগুলি ক্রমশ সিন্ডিকেটের দখলে চলিয়া গিয়াছে। ফলে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করিয়া থাকে বিভিন্ন অসাধু চক্র। ইহা ছাড়া গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি চিঠি হইতে জানা যায়, দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য কারণ গ্রামগঞ্জের হাটবাজারের অব্যবস্থাপনা ও নীরব চাঁদাবাজি। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির অবহেলা ও অনিয়মের কারণে ইজারাদাররা ইচ্ছামতো টোল বা খাজনা আদায় করিতেছেন। ফলে ইহার ক্ষতি পোষাইতে বিক্রেতারা দ্রব্যমূল্য বাড়াইয়া দিতেছেন। এই বিষয়টিও সরকারকে আমলে নিতে হইবে।
বর্তমানে প্রতিদিনই হুহু করিয়া মূল্য বাড়িতেছে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের। প্রতি বৎসর মাহে রমজানের আগেভাগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কয়েক দফা বৃদ্ধি পায়। ইহা এক ধরনের অপকৌশল বইকি। কিন্তু যেই হারে বাড়ে, পরে সেই হারে কমিতে দেখা যায় না। বিশেষ করিয়া, এখনকার আলোচ্য বিষয় ভোজ্য তেল। ভোজ্য তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। বিভিন্ন বাজার ঘুরিয়াও ইহার দেখা কিংবা নাগাল পাওয়া যাইতেছে না। ইহা লইয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের ছলচাতুরী চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করিতেছে ভোক্তাদের জীবনে। সম্প্রতি গণমাধ্যমের সামনে এক ভোক্তা আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, ‘দেখেন ভাই, বোতলে লেখা ৮৫২; কিনলাম ৮৮০ টাকায়। এই পাঁচ লিটারে যে আমার ২৮ টাকা বেশি দিতে হইল, তাইলে দ্যাশে পরিবর্তনটা হইছে কী?’ সত্যিই তো, তাহার এই দাবিকে অহেতুক ও অযৌক্তিক বলিবার অবকাশ নাই। অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি লইয়াও ক্ষোভের দহন পরিলক্ষিত হইতেছে ভোক্তাদের মধ্যে।
অযাচিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্রেতারা যেমন ফুঁসিতেছেন, তেমনি ত্যক্তবিরক্ত হইয়া উঠিতেছেন ক্ষুদ্র বা খুচরা ব্যবসায়ীগণও। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার হইতে বোতলজাত সয়াবিন তেল রাতারাতি উধাও হইয়া যায় কীভাবে? গুটিকতক দোকানে তেল পাওয়া গেলেও গুনিতে হইতেছে বাড়তি অর্থ। ফলে খোলা তেলের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। তেল লইয়া এই তেলেসমাতি দেশের মানুষকে নিষ্ক্রিয় দর্শক হইয়া আর কতকাল দেখিতে হইবে, তাহাই বড় প্রশ্ন।
আমদানিসংকট দেখাইয়া কোম্পানিগুলি তেল সরবরাহ তলানিতে নামাইয়া আনে এবং তাহার পর কোনো একটি খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করাইয়া নিজেদের ইচ্ছামতো মূল্য বাড়াইয়া বাজারকে অস্থির করিয়া তোলে। ভোজ্য তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজারে এইভাবে তাহারা ‘কৃত্রিম সংকট’ সৃষ্টি করে। জানা যায়, খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই দুই-দুইটি সংস্থার পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির এমন চিত্র। তথাপিও তাহাদের যেন কিছুই করার নাই! ভোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হইল, ‘শুধু বাজার পরিদর্শনে গিয়া ছোট ছোট ব্যবসায়ীকে জরিমানা করিয়াই দায় সারিয়া থাকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি।’ উপরন্তু, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও প্রায়ই বলিয়া থাকেন, ‘তদারকি আরো জোরদার করা হইবে। অচিরেই সংকট কাটিয়া যাইবে।’ কিন্তু এই ধরনের আশ্বাসের পরও বাজারের চিত্র তেমন বদলাইতে দেখা যায় না।
ট্যারিফ কমিশন সূত্রে সম্প্রতি জানা গিয়াছে, দেশে প্রতি মাসে তেলের চাহিদা সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ৭০ হাজার টন। ১২টি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ২৫ হাজার ৫০০ টন উৎপাদনক্ষমতার পাশাপাশি আমদানিও হইতেছে পর্যাপ্ত পরিমাণ। তাহা হইলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠিতে পারে, এত তেল যাইতেছে কোথায়? বিভিন্ন সময় ভোক্তারা একটি গুরুতর অভিযোগ করিয়া থাকেন যে, ‘সিন্ডিকেট রহিয়া গিয়াছে আগের মতোই।’ সমস্যার শিকড় মূলত এইখানেই। আমাদের দেশে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ হইল, এইখানকার অবৈধ মজুত সিন্ডিকেট। বিগত সরকারগুলি এই সিন্ডিকেট ভাঙিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নিকট ভোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকার আন্তরিক হইলেই কেবল দীর্ঘদিনের এই সংকটটির অবসান ঘটিতে পারে।
পবিত্র মাহে রমজান অত্যাসন্ন। যেইখানে অন্যান্য মুসলিম দেশে এই সময় বিভিন্ন পণ্যের মূল্য কমে, সেইখানে রমজানের আগে হইতেই দেশের বাজার প্রতি বৎসরই চরম অস্থিতিশীল হইয়া উঠিবে কেন? আমরা এই বৎসর ইহার ব্যত্যয় দেখিতে চাই। পবিত্র এই মাস সম্মুখে রাখিয়া ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুর ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনশীল হইয়া উঠুক-ইহাই সকলের কাম্য। এই জন্য এই বার আগেভাগেই কার্যকর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। কর্তৃপক্ষের কথার সহিত কাজের সামঞ্জস্য বজায় রাখিতে হইবে।