বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা

ফারজানা ইয়াসমিন রুমি

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল—এ কথার সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষ পরিচিত। এদেশের সবার স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে স্বাধীনতার পর থেকে সরকার স্বাস্থ্যসেবার ওপর কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মৌলিক স্বাস্থ্যসুবিধাসমূহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে কাজ করে যাচ্ছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কিছু সূচক যেমন শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, শিশু ও মায়েদের টিকা দেওয়া, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি দূরীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসাধারণ অর্জন সাধিত হয়েছে। কিন্তু সরকার স্বাস্থ্য খাতে নজর দেওয়া সত্ত্বেও এ খাতে হুমকি বা অবহেলা যেন রয়েই যাচ্ছে। এদেশের মানুষ প্রতিনিয়ত যেন স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। স্বাস্থ্য খাতে যেসব সমস্যা দেখা যায়, তার পরিমাণ কম নয়। স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বছরে বছরে বাড়ছে। অন্যদিকে এ খাতে সরকারের ব্যয়ের অংশ কমে যাচ্ছে। ওষুধ ও চিকিত্সা সরঞ্জাম কিনতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে। স্বাস্থ্যসেবার মান সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল ও আফগানিস্তানের ওপরে এবং শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের নিচে হলেও এদেশের মানুষ মানসম্মত সেবার আশায় বিদেশের দিকে ছুটছে। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অগ্রগতি আছে, কিন্তু আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়নও জরুরি। যেখানে ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, সেখানে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো অলীক কল্পনাই বটে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সার ব্যয় এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা যায়। কিন্তু ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে একজন চিকিত্সকের বিপরীতে চিকিত্সাপ্রার্থী মানুষের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৭৯ জন। সে অনুযায়ী সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:৬৫৭৯। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১:১৮৪৭। এদিকে বর্তমানে অপ্রতুল নার্স দিয়ে চলছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিত্সক, নার্স ও মিডওয়াইফ বাংলাদেশে ৬.০৬ জন। যেখানে ডাক্তারের পাঁচ গুণ বেশি নার্স থাকার কথা।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের কিছু অর্জন থাকলেও তা সীমিত, যা দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের প্রতিপাদ্যের বিষয় সর্বজনীন সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। ২০১৮-১৯ সালে মোট বাজেটের ৫.০৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। এটা গতানুগতিক একটা বরাদ্দ, যা ক্রমাগতভাবে গত ১০টি বাজেটে কমে আসছে। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫.১৬ শতাংশ। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ২৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী অনেক চমক থাকলেও এই বাজেট গরিববান্ধব নয়, তা স্বাস্থ্য বাজেটেই প্রমাণ মিলছে। এখন সারা বিশ্বে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার কথা বলা হচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তখনই হবে, যখন সব মানুষ প্রয়োজনীয় ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং এই সেবা পেতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ পড়বে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় একদিকে সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে সমতা ও মানবাধিকার অর্জন করা সম্ভব হয়। এমন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিজ নিজ দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতীয় আয়ের বা জিডিপির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা বাঞ্ছনীয়। তবে তাদের সুপারিশ হচ্ছে জাতীয় আয় বা জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ যেন স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ তার ধারেকাছে নেই। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৯৪ শতাংশ, অর্থাত্ ১ শতাংশেরও কম। আফ্রিকা ও এশিয়ার কোনো দেশই জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়নি, কিন্তু তারা অন্তত ১ শতাংশেরও পরে আছে, বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে স্বাস্থ্য খাতে এই বরাদ্দ লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেতে হলে রোগীকে মোট খরচের ৬৭ শতাংশ বহন করতে হয়, যা ‘আউট-অব-পকেট ব্যয়’ হিসেবে পরিচিত। অর্থাত্, সম্পূর্ণ সেবা পেতে হলে রোগীকে নিজেই খরচের একটি বড়ো অংশ জোগাতে হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রায় ৩.৩ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা বলতে মূলত চিকিত্সা খরচই বোঝায়। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ধরাই হয় না। তাহলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও এবং নুষের আয় বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে চিকিত্সার জন্য বা ওষুধ কেনার জন্য।

n লেখক : শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য অর্থনীতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়