একচুল দূরত্বে সাড়ে তিন হাত জমি

অর্থবিত্ত সকলেই চাহে। সকলের সচ্ছল-স্বাচ্ছন্দ্য ও বৈভবময় জীবন চাহে। সম্পদ অর্জনের লোভ সকলেরই। বলা হয় যে, ‘লোভ’ হইল আধুনিক সমাজের চালিকাশক্তি; কিন্তু উহার লাগাম থাকা প্রয়োজন। যদি লাগাম না থাকে, তাহা হইলে তিনি সীমা লঙ্ঘনের জন্য বিপদে পড়িবেনই। দেখা গিয়াছে, পৃথিবীতে যত বিবাদবিসংবাদ-অনাসৃষ্টি হইয়াছে, তাহা ঘটিয়াছে সীমা লঙ্ঘনের কারণেই। এই জন্য বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, কোনো মানুষ যদি তাহার লোভের দাঁড়ি-কমা না টানিতে পারেন, তাহা হইলে তিনি পাগল হইয়া যাইবেন। অনেকের মধ্যেই এই পাগলামি রহিয়াছে। তাহারা নিজেদের চালাক মনে করিয়া অত্যন্ত গোপনে এমন সকল কাজ বা পরিকল্পনা করিতে চাহেন—যাহার পরিপ্রেক্ষিতে তাহারা মনে করেন, তাহারাই সবচাইতে বড় পরিকল্পনাকারী; কিন্তু তাহারা যেন ভুলিয়া যান সুরা আনফালের ৩০ নম্বর আয়াত—‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবচাইতে উত্তম পরিকল্পনাকারী।' এই আয়াত আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, মানুষ যত পরিকল্পনাই করুক না কেন, তাহার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা।

বিশ্বসাহিত্যে লোভের পরিণতির অগণিত দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। লেভ তলস্তয়ের ‘সাড়ে তিন হাত জমি' গল্পে পাখোমের পরিণতি দেখাইয়া দেওয়া হইয়াছে—অতিরিক্ত সম্পদের আকাঙ্ক্ষা তাহাকে এমন এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় নামাইয়াছিল, যাহার শেষ পরিণতি হইল তাহার মৃত্যু। সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি জমি দখল করিতে পারিবে, তাহার মালিক হইবে—এই শর্তে জমি দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া সে দিগ্বিদিক ছুটিতে লাগিল। অবশেষে ক্লান্ত ও শ্রান্ত শরীরে মূল জায়গায় ফিরিয়া আসিবার পূর্বমুহূর্তে তাহার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাহার প্রয়োজন হইল মাত্র সাড়ে তিন হাত জমি।

মানুষের প্রয়োজনীয় সম্পদ অর্জনের অধিকার রহিয়াছে; কিন্তু তাহা সংযমের গণ্ডির মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। এবং সেই গণ্ডি ঠিক করিয়া দেয় আমাদের বিবেক। গুণীজনেরা এই জন্য বলিয়াছেন—পৃথিবীতে সকলের প্রয়োজন মিটাইবার জন্য যথেষ্ট সম্পদ রহিয়াছে; কিন্তু তাহা কোনো ব্যক্তির লোভ মিটাইবার জন্য যথেষ্ট নহে। বস্তুত, শুধু ব্যক্তি জীবনে নহে, রাষ্ট্রীয় জীবনেও লোভ ও সীমা লঙ্ঘন ভয়ানক বিপর্যয় ডাকিয়া আনিয়াছে। হিটলারের, ঔদ্ধত্য, অমিত লোভ ও বিশ্ববিজয়ের নেশাই বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাইয়াছিল; কিন্তু সেই ভয়ানক যুদ্ধের পরিণতি কী হইয়াছিল? মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত ইউরোপ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সীমা লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিই হউক বা রাষ্ট্র, তাহার পরিণাম কখনোই শুভ হয় নাই।

অনিয়ন্ত্রিত লোভ ও হিংসা-জিঘাংসা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আমাদের সংবরণ করিতে হইবে স্ব-স্ব জিহ্বা। বিশেষ করিয়া যাহারা যত বড় পদে আসীন, তাহাদের জিহ্বা তত বেশি স্পর্শকাতর। জিহ্বার মতো ধারালো করাত পৃথিবীতে আর কিছু নাই। সেই করাত দিয়া হিংসাবশত অন্যকে রক্তাক্ত করিলে তাহার প্রত্যাঘাত কখনো না কখনো চলিয়া আসে। ইহা সকলের জন্যই সত্য। এত যে লোভ-হিংসা-হানাহানি—অথচ আমরা কেহই জানি না আজই আমাদের শেষ দিন কি না? রাতে যখন ঘুমাইতে যাইব, আমরা জানি না—এই ঘুম আর কখনো ভাঙিবে কি না? ঘুম ভাঙিলে সকাল, না ভাঙিলে পরকাল। সাড়ে তিন হাত ভূমি হইতে আমরা একটি অতি পলকা সুতার ব্যবধান দূরত্বে দাঁড়াইয়া আছি। সেই সুতা—যে কাহারো যখন-তখন ছিঁড়িয়া যাইতে পারে। দুঃখজনক—সেইদিকে কাহারোই হুঁশ নাই! আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার ক্রীড়ানক মাত্র। আমাদের পরিকল্পনার কোনো মূল্যই নাই। সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। এই জন্য দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস বলিয়াছেন, ‘প্রতিদিন নিজেকে বলিও, আজই হয়তো আমার জীবনের শেষ দিন।' এই আত্মোপলব্ধি যদি মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয়, তবে সে কখনোই সীমা লঙ্ঘন করিতে সাহস পায় না।

সুতরাং, আমাদের নিজ নিজ বিবেকের দ্বারা চালিত হইতেই হইবে। তাহা না হইলে, আমাদের পরিণতি হইবে সেই পাখোমের ন্যায়। বিপুল লোভের পিছনে ছুটিতে ছুটিতে একদিন দেখিব, আমরা পড়িয়া রহিয়াছি কেবল সাড়ে তিন হাত ভূমির নিচে!