বর্তমান নেপালের রাজনৈতিক অচলাবস্থা প্রসঙ্গে 

আবারও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি নেপাল। আবারও একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক সংবিধান অনুমোদন করার পরও ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলাদলি এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে সংকটের মুখোমুখি। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং খণ্ডকালীন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতা এখনকার অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির সব প্রতিশ্রুতিকে গ্রাস করে ফেলেছে।

ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যকার সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলি প্রমাণ করেছে, নেপালের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল। ফেডারেল বা প্রাদেশিক সরকারগুলিতে দল এবং নেতাদের ঘন ঘন পুনর্বিন্যাসের কারণে জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কিন্তু নেতাদের জীবনযাত্রার মান রাজপরিবারের চেয়েও ওপরে উঠে গেছে। এখন মানুষ বলতে শুরু করেছে, 'দশ হাজার মহারাজাকে খাওয়ানোর চেয়ে একজন মহারাজাকে (রাজাকে) খাওয়ানো ভালো।' সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখানে জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, যুব বেকারত্ব দূরীকরণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে এবং ভারত ও চীনের সঙ্গে নেপালের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টা স্পষ্ট না করে রাজনৈতিক দলগুলো বরং তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল এবং সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র)-এর মতো প্রধান দলগুলি তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করেছে। তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে অক্ষমতার কারণে আইন প্রণয়নের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এত ছোট একটি দেশের জন্য ফেডারেলিজম বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বিশাল আর্থিক বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেডারেল সরকার এবং পাঁচটি প্রাদেশিক সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন ৮৫০ জন। একইভাবে, প্রায় ৪০ হাজার জন রয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধি। তাদের বেতন-ভাতা দিতে দাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। নেপালের নাগরিকদের ইতিমধ্যে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার নেপালি রুপি।

দেশটি বর্তমানে প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। কিছুই রপ্তানি করতে পারে না। একসময় নেপাল ভারতে চাল ও সরিষা রপ্তানি করত। কিন্তু সেটি এখন অতীতের রূপকথা হয়ে গেছে। এখানে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো কর্মসংস্থান নেই। যে কিছু চাকরির সংস্থান আছে, সেগুলো কেবল রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররাই পেয়ে থাকে। এ কারণে নেপালের গ্রামে এখন তরুণদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের প্রায় সবাই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে কাজ করতে গেছে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (টিআইএ)-এর ইমিগ্রেশন অফিসের মতে, 'গত পাঁচ বছরে নেপাল থেকে প্রায় ৩১ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গেছে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশটির অর্থনীতি কোনোমতে টিকে অছে। আমাদের অর্থনীতির ৫০ শতাংশ রেমিট্যান্সনির্ভর।'

অধিক অন্তর্ভুক্তি ও বিকেন্দ্রীকরণের সুফলের ধুয়া তুলে প্রবর্তিত ফেডারেলিজম বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেপালের জন্য বিশাল প্রশাসনিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতার অভাব, ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে দুর্বল সমন্বয় এবং দ্বৈত শাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেপালে ব্যয়বহুল ও অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এদিকে আদালত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত তাদের স্বতন্ত্র সত্তা ও পরিচয় হারিয়ে রাজনৈতিক শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। যে কারণে গণতন্ত্র সুসংহত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় থাকছে না।

নেপালে নেতৃত্বের পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। নেতাদের 'স্বল্পমেয়াদি (আখের গোছানোর) রাজনীতি'র চেয়ে দেশের মঙ্গল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে মঙ্গল ও জন্য যুবসমাজ, সুশীল সমাজ এবং সচেতন ভোটারদের চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কারণ রাজনৈতিক দুর্নীতির উৎপত্তি এখান থেকেই।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে নেপাল দুটি পরাশক্তির মধ্যখানে অবস্থিত। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে দেশটি এই অবস্থানের সুবিধা নিতে অক্ষম। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে কেবল রাজনৈতিক দলগুলোকেই নয়, বরং উন্নত ভবিষ্যতের আশা করা প্রতিটি নেপালিকে এর মূল্য দিতে হবে।

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে নেপালের রাজনৈতিক বিতর্কে সাবেক রাজা জানেন্দ্রের নাম আগের চেয়ে বেশি করে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে। যদিও অনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৮ সালে দেশটি একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, তবুও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো এবং বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা নাগরিকদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পুরোনো রাজতন্ত্রের প্রতি দুর্বলতা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

২০০৫ সালের রাজকীয় ব্যু এবং প্রত্যক্ষ শাসনের জন্য একসময় ব্যাপকভাবে সমালোচিত রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে এখন জনগণের একটি অংশ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। কেউ কেউ তাকে জাতীয় পরিচয়, স্থিতিশীলতা এবং শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছে। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এসব উপাদান দিন দিন গৌণ হয়ে যাচ্ছে। 
ব্যাপক দুর্নীতি, প্রশাসনে ঘন ঘন পরিবর্তন এবং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে জনগণের মধ্যে যে আস্থার শূন্যতা দেখা দিয়েছে, সেই শূন্যস্থানে রাজতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রতি তাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে।

খুব বড় আকারে না হলেও রাজতন্ত্রের পক্ষে দেশব্যাপী ঘনঘন বিক্ষোভ হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধরা রাজতন্ত্র পুনর্বহালের জন্য গণভোটের দাবি তুলছে, হিন্দু রাষ্ট্রের জন্য স্লোগান দিচ্ছে, পুরোনো জাতীয় পতাকা উত্তেলন করছে। নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যদিও এসব বিক্ষোভকারী এখনো নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে প্রমাণ করতে পারেনি।

তবে, এই গণআন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন রাস্তা নেবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। বর্তমানে যে রাজতন্ত্রকে অনেকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখছে, একসময় তা জাতীয় অস্থিরতার করণ ছিল। রাজা জানেন্দ্রর কর্তৃত্ববাদী শাসনের কথাও সবার মনে আছে। তার পরও চলমান অস্থিরতা নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং বছরের পর বছর ধরে কষ্টার্জিত গণতান্ত্রিক অগ্রগতির কবর রচনা করতে পারে।

রাজতন্ত্রে ফিরে যেতে যে ঢেউ নেপালে উঠেছে সেটি দেশটির রাজনৈতিক অভিজাতদের কাছে একটি বড় বার্তা হিসেবে কাজ করা উচিত। এই ঢেউ মূলত নিরঙ্কশ রাজতন্ত্রের প্রতি তাদের ভালোবাসা নয়, বরং গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের দেশ পরিচালনায় অক্ষমতার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। ক্ষমতাসীন দলগুলি যদি তাদের নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চর্চা অব্যাহত রাখে, যদি জনগণের প্রতি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও নিজেদের আখের গোছানো নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে জনগণের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থাই আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হতে উঠতে পারে, সেটি যতই পশ্চাৎমুখী হোক না কেন।

• লেখক: কাঠমান্ডুতে বসবাসরত ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী