শুধু এআই নহে-বিবেকের চোখও সজাগ থাকুক

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৬:০০

একটি মহানগরের নাগরিকদের সভ্যবোধ পরিমাপ করিবার বহু উপায় আছে। ইহার মধ্যে ইকটি সুক্ষ্ম মানদণ্ড হইল-সেই মহানগরের মানুষ ট্রাফিক আইন কতখানি মানে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মোড়ে স্থাপিত এই ক্যামেরাগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করিতেছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা ও জরিমানা করা হইতেছে। পরীক্ষামূলক চালুর পর অল্প কয়েক সপ্তাহেই শত শত যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে। বিশেষত বাসের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সর্বাধিক। এই উদ্যোগকে শুধু প্রযুক্তির প্রয়োগ বলিলে ভুল হইবে। ইহা মূলত মানুষের আচরণ পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা। কারণ ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি এড়ানো সম্ভব হইলেও সর্বক্ষণ জাগ্রত একটি যান্ত্রিক চোখকে ফাঁকি দেওয়া কঠিন। দেখা গিয়াছে, ক্যামেরা স্থাপনের পর অনেক চালক জেব্রা ক্রসিংয়ের পূর্বেই গাড়ি থামাইতে শুরু করিয়াছেন এবং সিগন্যাল মানার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাইয়াছে।


বিশ্বের বহু শহর ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করিতেছে। সিংগাপুরের স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, লন্ডনের এএনপিআর (অটোমেটিক নাম্বার প্লেট রিকগনিশন), দুবাইয়ের এআই-নিয়ন্ত্রিত সড়ক পর্যবেক্ষণ, নিউ ইয়র্কের রেড-লাইট ক্যামেরা, সাংহাই ও বেইজিংয়ের বুদ্ধিমান ট্রাফিক নেটওয়ার্ক-সবখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যানবাহনের গতি, সিগন্যাল অমান্য, অবৈধ পার্কিং এবং নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হইতেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি দুর্ঘটনা কমাইতে এবং যান চলাচলের দক্ষতা বৃদ্ধি করিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখিয়াছে।


তবে প্রযুক্তির সাফল্যের পিছনে কেবল যন্ত্রের ক্ষমতা নহে, তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ক্ষেত্রেও ক্যামেরা নম্বরপ্লেট শনাক্ত করিয়া বিআরটিএর তথ্যভান্ডারের সহিত মিলাইয়া অপরাধীর পরিচয় নির্ধারণ করিতেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থা সঠিক ও হালনাগাদ থাকে। কিন্তু যে কোনো প্রযুক্তির মতো ইহারও সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, এআই ক্যামেরা সকল সময় শতভাগ নির্ভুল নহে। আবহাওয়া, আলোর স্বল্পতা, নম্বরপ্লেটের অস্পষ্টতা কিংবা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুল শনাক্তকরণ ঘটিতে পারে। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র নিয়ম ভাঙা ধরিতে পারে, কিন্তু নিয়ম ভাঙার কারণ বুঝিতে পারে না। কোনো চালক জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সম্মুখীন হইলে ক্যামেরা তাহার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করিবে না। ফলে মানবিক বিচারের প্রয়োজন কখনোই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হইল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। শহরের সর্বত্র ক্যামেরা বসানো মানে নাগরিকের চলাফেরা সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা। গণতান্ত্রিক সমাজে এই তথ্যের ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকিলে অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি হইতে পারে। উন্নত দেশগুলিও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতেছে।


তদুপরি, প্রযুক্তি নূতন ধরনের অপরাধেরও জন্ম দেয়। ঢাকায় ইতিমধ্যে এআই জরিমানার নামে ভুয়া বার্তা পাঠাইয়া প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়াছে। আবার কোনো কোনো ব্যক্তি নম্বরপ্লেট আংশিক ঢাকিয়া ক্যামেরাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিয়াছে। তবে সামগ্রিক বিচারে এআই ক্যামেরার সবচাইতে বড় অবদান হইল-ইহা আইন প্রয়োগকে ব্যক্তিনির্ভরতা হইতে প্রক্রিয়া-নির্ভরতার দিকে লইয়া যায়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকারি গাড়ি কিংবা সাধারণ নাগরিক-সকলের জন্য একই নিয়ম কার্যকর হওয়া সম্ভব হয়। আমাদের ইহাও মনে রাখিতে হইবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই নাগরিক দায়িত্ববোধের বিকল্প নহে। ক্যামেরা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করিতে পারে, কিন্তু মানুষকে বিবেকবান করিতে পারে না। শৃঙ্খলা যদি কেবল জরিমানার ভয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ক্যামেরা সরিয়া গেলে সেই শৃঙ্খলাও বিলুপ্ত হইবে। কিন্তু যদি প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে নিয়ম মানিবার সংস্কৃতি গঠনে সহায়ক হয়, তবে তাহার প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।


অতএব, এআই ক্যামেরা আসলে কোনো জাদুকাঠি নহে। ইহা এক প্রকার আয়না, যাহা আমাদের সড়ক-সংস্কৃতির প্রকৃত চেহারা দেখাইয়া দেয়। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আমাদের নাগরিক চরিত্রের। যন্ত্রের চোখ যতই তীক্ষ্ণ হউক, একটি সভ্য নগর গড়িবার জন্য মানুষের বিবেকের চোখকেই শেষ পর্যন্ত জাগ্রত হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন