বর্ষাকাল হচ্ছে গাছ লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় গাছ লাগালে খুব দ্রুতই তা মাটির মাঝে শিকড় ছড়ায়। তাই বৃক্ষপ্রেমীরা গাছ লাগানোর জন্য এই সময়টাকেই বেছে নেন। বাড়িতে ভিটার খালি পড়ে থাকা এক খইমব জমিতেই হোক কিংবা ছাদে, বর্ষা এলে গাছ লাগানোর ধুম পড়ে যায়। যার এমন কোনো জায়গা নেই, তার ভরসা ছোট্ট বারান্দার এক কোণ। তারপরও কচি সবুজ গাছের পাতা গজিয়ে রোদে চোখ মেলে, তা দেখার এক তীব্র নেশা কাজ করে মানুষের মনে। এ এমন এক সৌন্দর্য, যা ঘোর লাগায় বৃক্ষপ্রেমী মানুষের চোখে। সাধারণ্যে খুব আলোচনা দেখা না গেলেও এই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে গাছ লাগানোর একটা জাতীয় উত্সব শুরু হয়ে যায় দেশে।
সামাজিক বনায়নের কারণে সারা দেশেই গ্রামাঞ্চলে গাছ লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে। সেই প্রভাব দেখা যায় শহুরে জীবনেও। প্রত্যেকেই তার বাড়ির এক কোণে অল্প করে হলেও গাছ রাখে। ছাদবাগান তো এখন শহরের মানুষের কাছে রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বন অধিদপ্তরের সহকারী বন সংরক্ষক হুমায়ূন কবীর জানালেন, গাছ লাগানোর প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এর সুফল হিসেবে দেশের বনভূমির পরিমাণ বেড়েছে। বন বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের কারণে সামাজিক বনায়নের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে দেশের বনভূমি কমে ৯ ভাগে এসে দাঁড়ায়। এখন দেশের বনভূমি ১৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ সামাজিক বনায়নের কারণে সৃষ্ট বনভূমি।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাণিজ্য মেলার মাঠে এক মাস ধরে চলছে বৃক্ষমেলা। রাজধানীতে প্রতিবছরই জাতীয় বৃক্ষমেলা আয়োজন শহরের মানুষের কাছে সবুজ প্রাণের হাতছানি নিয়ে উপস্থিত হয়। আকাশ কালো করা মেঘ, কালবৈশাখীর আশঙ্কা উপেক্ষা করে এই শেষ বেলায়ও চলে এসেছেন বৃক্ষপ্রেমীরা। ঘুরে ঘুরে গাছের খোঁজ করছেন। প্রয়োজনমতো কিনছেন।
বৃক্ষমেলায় হাজারো গাছ :এখন রাজধানীতে ছাদে বাগান করার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে মানুষের। মেলায় স্থান পাওয়া স্টলগুলোতে ছাদবাগানের উপযোগী গাছের সংগ্রহ রয়েছে অনেক। রয়েছে অর্কিড, বনজ, ফলদ ও ফুলের গাছ। নার্সারির মালিকরা জানালেন, মানুষের ফলদ গাছের প্রতি আগ্রহ বেশি। বিশেষ করে আমগাছ বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। জাতীয় বৃক্ষের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখে নানা জাতের আমগাছের সমাহার রয়েছে মেলায়। এর মধ্যে ল্যাংড়া, ফজলি, হিমসাগরের নাম তো সবার জানা। হালের আম্রপালিও বেশ জনপ্রিয়। তবে লতা বোম্বাই, আরটি-২, ক্যান, পালমার, মহাচনক, ফোর কেজি প্রভৃতি বিদেশি জাতের আমগাছের কদর বাড়ছে।
কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ১৩৯ জাতের গাছের চারা নিয়ে এসেছে বৃক্ষমেলায়। এর মধ্যে ফলের জাত ৬৭টি, ফুলের জাত ৩৫টি, ঔষধি ২০, বনজ ৩, মসলা ৮, অর্কিড ৩ ধরনের জাতের রয়েছে। কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তারা নতুন জাতের খোঁজ নিয়ে গাছ লাগাচ্ছে। গাছের গুরুত্ব বুঝতে শিখছে মানুষ। তিনি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ করপোরেশন নতুন জাতের গাছ দেশের আবহাওয়ায় গড়ে তুলে তা রোপণের জন্য উত্সাহিত করছে।
বৃক্ষমেলার দোকানিরা জানালেন, মেলায় বিক্রি বেশি হয় ফল ও শোভাবর্ধক গাছ। এরপর রয়েছে ফুলের গাছ। শোভাবর্ধক বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে প্যাগোড, বিভিন্ন রকমের ক্যাকটাস, সাইকাস লাউ, পাতালতা, এথনোরিয়াম, বিভিন্ন রকমের বনসাঁই, ফিছুদিয়া পাম, কুচিয়াবল, মুনস্টার, বিচিত্র ড্রেসিনা, বনঝাউ, নদীঝাউ ইত্যাদি। ঔষধি গাছ নিয়ে এসেছে ডজনখানেক নার্সারি। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে দারুচিনি, জাকের আন্দা, আলুবেড়া, পোলাও পাতা, মিশ্র মসলা, পাথরকুচি, অড়হর, উলটকম্বল, আকন্দ, রামতুলসী, তুলসী, শজিনা, পুদিনা, চন্দন, তমাল, নাগেশ্বর, অর্জুন, শিমুল, হরীতকী, রেইনট্রি, চই, ছাতিয়ান, নাগলিংগম, উলটচন্ডাল, কাঠবাদাম ইত্যাদি। এলাচি লেবু, জামরুল, মিষ্টি করমচা, আনারস, ডালিম, লটকন, আঙুর, মিশরি ডুমুর, কামরাঙ্গা, বিভিন্ন রকমের পেয়ারা, হরেক রকমের বরইসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের নানা মৌসুমের ফলদ বৃক্ষের চারা ও কলমের বিক্রিও বেশ ভালো।
ছাদবাগান :বর্ষাকালে আপনার বাগান অথবা টবের গাছগুলোর সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে লাগাতে পারেন নতুন কিছু গাছ। বেসরকারি এনজিওতে চাকরি শেষে আয়মা খানম খিলগাঁওয়ে নিজের বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন বাগান। রয়েছে লাউ, কুমড়া, করলা, ঢ্যাঁড়শ ও পুঁইশাক। আরও আছে আম, পেয়ারা ও আমড়াগাছ। এসব সবজি ও ফলের পাশাপাশি করেছেন ফুলের বাগান। এর নিয়মিত দেখভালও করেন তিনি।
অনেকেরই ছোটো ফ্ল্যাট বা বাসার বারান্দায় বাগান করার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু বাগান মানে দু-তিনটা টবে এলোমেলোভাবে গাছ লাগানো নয়। পরিকল্পনা করে নিজের ইচ্ছামতো শৈল্পিকভাবে গাছ লাগাতে হবে। তবেই বারান্দায় বাগান বোঝা যাবে। বারান্দার বাগানের সুবিধা হলো, এখানে ঋতুভিত্তিক গাছ লাগানো যায়। বারান্দায় বাগান করার কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। নার্সারি থেকে টবের গাছ বাসায় আনার পর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ, গাছটি সঠিক পরিবেশ ও যত্ন কিছুই পায় না। এজন্য অনেক সময় গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, পাতা ঝরে যায় বা গাছটিই মরে যায়। তাই গাছের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিমিত আলো ছাড়া গাছ খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে না। ফলে মৃত্যু অবধারিত। তাই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাধারণত চিরসবুজ গাছ, যাতে ফুল হয় না, সেটাতে অর্ধেক বেলা আলো পেলে ভালো থাকে। যেসব গাছে ফুল হয়, সেগুলো সম্পূর্ণ সূর্যালোকে ভালো থাকে। গাছে ফুল আসার জন্য নির্ভর করে, দিনের কতটা সময় সূর্যের আলো গাছটা পাচ্ছে।
মাটির টবই গাছের জন্য সবচেয়ে ভালো। কেউ চাইলে প্লাস্টিক, সিরামিক বা কাঠের টব ব্যবহার করতে পারেন। গাছ অনুসারে টব কিনবেন। স্বাভাবিক বিকাশের জন্য টবের স্থান পরিবর্তন করতে হবে। আর মাটি হচ্ছে গাছের ভিত্তি। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী কতটুকু মাটি লাগবে, গাছের জন্য ততটুকু ব্যবহার করবেন। টবের গাছের জন্য অল্প পরিমাণে সার দিতে পারেন। তবে সব পরিবেশেই গোবরের সার ব্যবহার করতে পারেন। এর পরিমাণ কম-বেশি হলে গাছের বিশেষ ক্ষতি হয় না।
প্রশিক্ষণ :মানুষের মধ্যে ছাদবাগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ছাদে বাগান করতে প্রশিক্ষণও চালু হয়েছে। বারিধারার উন্নয়ন সংস্থা ‘লাইফ টু নেচার’ ছাদে বাগান করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে ছাদবাগানের টিপসও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের স্টল রয়েছে বৃক্ষমেলায়। এখানকার সমন্বয়ক হোসনে আরা খানম ও কামরুন নাহার বিনা জানান, ছাদবাগানের ক্ষেত্রে একেক ধরনের গাছের জন্য একেক রকম যত্নের প্রয়োজন হয়। সে জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। ছাদে বাগান করার কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেসব কীভাবে কাটানো যায় তা জানা জরুরি।