অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় প্রয়োজন বিনিয়োগে সবার অংশগ্রহণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। একদিকে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সঙ্কট; অন্যদিকে দেশে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও রপ্তানি আয় কমায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান সঙ্কট, আয় বৈষম্য ও মানুষের ক্রময়ক্ষমতা কমে যাওয়া। এক্ষেত্রে, আমাদের এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে স্বনির্ভরতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই; পাশাপাশি, বিনিয়োগ সচেতনতা বৃদ্ধি ও উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দশক ধরে গড়ে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৪.৩ শতাংশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। তবে একথাও সত্য যে, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এই তথ্যের অনেক গড়মিল রয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, দেশে আয় বৈষম্য ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে; যা দারিদ্র্যের মাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি, দেশের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ করছে। আবার দেখা যাচ্ছে, শহরাঞ্চলের আয় বৈষম্য গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর, শহর এলাকায় বেকারত্ব ও দারিদ্রের হারও বেশি। ফলে, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা ও তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

একইসাথে, বাংলাদেশের মানুষের সঞ্চয় প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কম, ফলে বিনিয়োগের পরিমাণও বেশ ছোট ছোট হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আমাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক নিম্নআয়ের মানুষের হাতে সঞ্চয় করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন যেখানে সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে খুব সহজে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দেখা যায়, মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষদের সঞ্চয়ের পরিমাণও ছোট অংকের হয়, এ ধরনের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে তারা ব্যাংকেও যেতে চান না।

সঞ্চয় ও বিনিযোগের ক্ষেত্রে ব্যাংকে অলস টাকা ফেলে রাখার মতোই আরও বেশকিছু প্রথাগত পদ্ধতি রয়েছে। এগুলো হলো – সঞ্চয়পত্র, পুঁজিবাজার, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ব্যবসা। এর মধ্যে ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট বা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ দেশের মূল্যস্ফীতির সাথে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা তা বোঝা সম্ভব নয়। দেশের পুঁজিবাজারও সবসময় টালমাটাল অবস্থায় থাকে। যথেষ্ট অভিজ্ঞ লোকদেরও পুঁজিবাজার থেকে লাভ বের করতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। আবার জমি বা ফ্ল্যাট বেচাকেনা নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ হলেও এই খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা আমাদের মধ্য ও নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে।

এক্ষেত্রে, দেশের সব শ্রেণির মানুষের উপযোগী হবে এমন একটি উপায় বের করতে হবে আমাদের। বিশেষ করে, টাকার মান কমলে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে বা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে, যা আমাদের দেশের মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য বেশ সাশ্রয়ী হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্বর্ণ। স্বর্ণের কথা বললে অনেকেই মনে করতে পারেন, এক্ষেত্রে তো অনেক টাকা প্রয়োজন, যেখানে ক্রমাগত স্বর্ণের দাম বেড়েই চলেছে। ছোট সঞ্চয় নিয়ে স্বর্ণে কীভাবে বিনিয়োগ করা যায় তা আলোচনার আগে এ সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও স্থিতিশীল অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে স্বর্ণ অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশেও গত ৫ বছরের হিসেবে স্বর্ণের দাম ১৩২ শতাংশ এবং ১০ বছরের হিসেবে ২৪৬.২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলো স্বর্ণে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়িয়েছে; যা স্বর্ণের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী আরও বৃদ্ধি করেছে।

স্বর্ণের বিষয়টি সারাবিশ্বে প্রায় একইরকম সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও স্থানান্তরযোগ্য। এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বর্ণে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যায়? সাধারণত মূল্যবান ধাতু হিসেবে স্বর্ণ বা স্বর্ণের গহনা কেনাবেচা সবার নাগালের ভেতর নাও থাকতে পারে। তবে, এক্ষেত্রে ‘গোল্ড কিনেন’-এর মতো আধুনিক ও উদ্ভাবনী ধারণা বেশ ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। এই অ্যাপে মাত্র ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। এর সাথে নূন্যতম ১ গ্রাম থেকে শুরু করে স্বর্ণ বার ও কয়েন আকারে ডেলিভারি দেওয়া যায় দেশজুড়ে। এতে স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতুকে অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের একদম হাতের নাগালে নিয়ে আসা হয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নানান পর্যায় অতিক্রম করছি আমরা। যেমন, বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিকাশের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একদম প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত, অর্থ লেনদেন, বিল পরিশোধের মতো বিষয়গুলোকে সবার জন্য সহজলভ্য করেছে এই সেবা। এধরনের সময়োপযোগী পদক্ষেপ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি, তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সবার জন্য জরুরি; বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো জায়গা যেখানে বেশিরভাগ মানুষই মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। বিনিয়োগের সহজ সুযোগ তৈরি করা না গেলে আসলে আমাদের পক্ষে শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

ফিনটেক এক্সপার্ট, উদ্যোয়ক্তা এবং ফাউন্ডিং ডিরেক্টর, ই-ক্যাব