প্রিয় ঘোড়াটি খুন হয়েছে, জানেন না শয্যাশায়ী মনু মিয়া

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মনু মিয়া। কারও মৃত্যুসংবাদ কানে আসামাত্রই খুন্তি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। বিনা পারিশ্রমিকে এভাবেই কবর খুঁড়ে যাচ্ছেন ৫০ বছর ধরে। ৬৭ বছর বয়সী মনু মিয়ার ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তিনি কবর খুঁড়েছেন ৩ হাজার ৫৭টি।

কয়েক বছর আগে কবর খুঁড়তে দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানি জমি বিক্রি করে একটি ঘোড়া কিনেছিলেন মনু মিয়া। এর পর থেকে ঘোড়াটিই হয়ে উঠেছিল তার পা, চালিকা শক্তি। রোগে কাবু মনু মিয়াকে ১৪ মে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই একরকম মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসা চলছে নিঃসন্তান মানুষটির। পাশে ছায়া হয়ে আছেন স্ত্রী রহিমা বেগম।

শুক্রবার (১৬ মে) সকালে মিঠামইন উপজেলার হাশিমপুর ছত্রিশ গ্রামের একটি মাদ্রাসার পাশে পানির মধ্যে মনু মিয়ার ঘোড়াটির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন এলাকাবাসী। ঘোড়াটির বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনু মিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা ভেবে স্ত্রী ও স্বজনেরা তার কাছে গোপন রেখেছেন ঘোড়াটি হত্যার কথা।

মুঠোফোনে মনু মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, ‘উনার (মনু মিয়ার) অবস্থা ভালো না। উনি জীবনে কারও কোনো ক্ষতি করেননি। এত দিন জানতাম উনাকে মানুষ ভালোবাসে। উনার এমন খারাপ অবস্থায় কী করে এমনভাবে উনার প্রিয় ঘোড়াটিকে মানুষ মেরে ফেলতে পারল। খবরটা আমরা উনাকে দিলে উনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারবেন না।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পাশের এলাকায়। এ ছাড়া রাজধানীর বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে তার সুনাম রয়েছে। শুধু কবর খনন করেই ক্ষান্ত হন না মনু মিয়া। এ পর্যন্ত যাদের কবর খুঁড়েছেন তিনি, তাদের মৃত্যুর দিন–তারিখ সব লিখে রাখেন নিজের ডায়েরিতে।

মনু মিয়ার সংকটকালে এভাবে তার প্রিয় ঘোড়াটিকে মেরে ফেলা হবে, সেটি কেউ ভাবতেও পারেননি। মনু মিয়ার প্রতিবেশী এস এম রিজন বলেন, মনু মিয়া সারা জীবন নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তার অনুপস্থিতিতে তার প্রিয় ঘোড়াটিকে এভাবে দুর্বৃত্তরা মেরে ফেলল। এটা খুবই নিন্দনীয় কাজ হয়েছে। এ অপরাধের বিচার হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত সরকার জানান, মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।