ভারতের মধ্যাঞ্চলের ছত্তিশগড় রাজ্যের খনিজসমৃদ্ধ বস্তার অঞ্চল এখন কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে। যার মূল লক্ষ্য মাওবাদী বিদ্রোহীদের সমূলে নির্মূল করা।
সরকারি ভাষ্যে অনুযায়ী এটি একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন, কিন্তু বহু অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক বলছেন, আসলে এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করে খনিজ সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টামাত্র।
মাওবাদী বিদ্রোহ: ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের শিকড় খুঁজতে হলে যেতে হয় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি বিদ্রোহে। পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামীণ কৃষক বিদ্রোহ ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি বৃহৎ সশস্ত্র বিপ্লবী আদর্শে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন কানু সান্যাল, চারু মজুমদার এবং জঙ্গল সাঁওতাল। যারা চীনের মাও সেতুংয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বাস করতেন, প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রামীণ দরিদ্রদের মুক্তি সম্ভব নয়।
১৯৬৯ সালে সেই ভাবাদর্শের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। যাদের মূল লক্ষ্য, সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা। তবে পরবর্তী কয়েক দশকের ভেতরে এই আন্দোলন ভেঙে যায়। দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পরে। বর্তমানে যার মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত ও সক্রিয় হলো কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী)। যেটি ২০০৪ সালে দুটি সশস্ত্র সংগঠন একসাথে হয়ে গঠন করা হয়।
বস্তার: একটি খনিজ ভাণ্ডার এবং বিদ্রোহের ঘাঁটি
বস্তার অঞ্চল ভারতের অন্যতম খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল, যেখানে প্রচুর পরিমাণে লৌহ আকরিক, কয়লা, বক্সাইট ইত্যাদি মজুদ রয়েছে। সরকারের হিসেব অনুযায়ী, ভারতের লৌহ আকরিক মজুদের ১৯% রয়েছে ছত্তিশগড়ে, যার একটি বড় অংশই বস্তারে। এই অঞ্চলেই কয়েক দশক ধরে মাওবাদীরা আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। এই অঞ্চলের মালিক শত শত বছরের মালিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা বহু ক্ষেত্রেই নিজেদের জমি ও জঙ্গলের সুরক্ষায় মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকেছে।
অপারেশন জিরো টলারেন্স: মাওবাদী নির্মূল না আদিবাসী দমন?
২০২৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছত্তিশগড়ে মাওবাদী দমনে নতুন করে জোরালো অভিযান শুরু হয়। নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স’। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেই ২০০-এর বেশি মাওবাদী নিহত হয়েছে। মাওবাদীদের প্রধান ঘাঁটি বলে পরিচিত বস্তারে ৩২০টিরও বেশি নিরাপত্তা শিবির স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শিবিরে ১৫০ থেকে ১২০০ পর্যন্ত নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন রয়েছে। এছাড়াও, এই অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, যেমন: উচ্চ-সংজ্ঞার ক্যামেরা, থার্মাল সেন্সর, ড্রোন ও হেলিকপ্টার। নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করছে, এই প্রযুক্তি তাদের অভিযানকে আরও কার্যকর করছে।
ভুয়া এনকাউন্টার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (PUCL) ও অন্যান্য সংস্থা অভিযোগ করছে, এই অভিযানের নামে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ২০২৪ সাল থেকে বস্তারে সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজের সভাপতি জুনাস তিরকি বলেন, নিরীহ আদিবাসীদের ‘মাওবাদী’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। শুধু ২০২৪ সালেই পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ কমপক্ষে ১১টি ভুয়া এনকাউন্টারের প্রমাণ পেয়েছে।
এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, মার্চ মাসে বিজাপুর জেলার বোর্দগা গ্রামে তিনজন মাওবাদী নিহত হওয়ার দাবি করে পুলিশ। কিন্তু গ্রামবাসীরা বলেন, তারা রাতের বেলায় ১৭ জনকে ধরে নিয়ে যায়, যাদের মধ্যে তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এটি এনকাউন্টার হলেও, কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি।
আদিবাসীদের বাস্তুচ্যুতি ও কর্পোরেট গোষ্ঠির স্বার্থ
এই অভিযানকে শুধুই নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে অনেকেই এটিকে সম্পদ দখলের একটি রণকৌশল বলেই মনে করছেন। বস্তারের ৫১টি খনিজ ইজারার মধ্যে ৩৬টি বেসরকারি সংস্থার হাতে রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আর্সেলর মিত্তলের মতো আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গোষ্ঠী। প্রাক্তন বিধায়ক মণীশ কুঞ্জম বলেন, ‘আসল লক্ষ্য খনিজ সম্পদ। সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে আদিবাসীদের সরিয়ে দিচ্ছে, যাতে কর্পোরেটরা নির্বিঘ্নে খনন করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০০৫ সালে যখন টাটা ও এসার খনিজ উত্তোলনের চেষ্টা করেছিল, তখন আদিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এখন সেই প্রতিরোধকে দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করা হচ্ছে।’
সালওয়া জুদুমের পুনরাবৃত্তি?
২০০৫ সালে কংগ্রেস-সমর্থিত একদল আদিবাসী যুবককে দিয়ে গঠিত হয় সালওয়া জুদুম, যার মাধ্যমে মাওবাদী দমনের নামে ব্যাপক গ্রাম উচ্ছেদ, হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এটি ছিল আধা-সরকারি মিলিশিয়া, যা মাওবাদীদের বিরোধিতা করত। সর্বোচ্চ আদালত ২০১১ সালে সালওয়া জুদুমকে অবৈধ ঘোষণা করলেও, আজ অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ‘নতুন নাম ও রূপে সেই একই নীতি আবার বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
উন্নয়ন নাকি লোভ?
ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই দাবি করেছেন, ‘খনি প্রকল্প ও শিল্পায়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের জীবনমান উন্নত হবে।’ তিনি বলেন, ‘ছত্তিশগড় খনিজ রাজস্বের দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় রাজ্য, এবং এই খাত থেকে রাজস্ব দ্রুত বাড়ছে।’ কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এই অঞ্চলে শিশু মৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি, এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পানীয় জলের মতো মৌলিক চাহিদার সংকট প্রকট। বস্তারে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৮০%। বিরোধী কংগ্রেসের মুখপাত্র সুশীল আনন্দ শুক্লা বলেন, ‘আজ বস্তার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। আদিবাসীদের উচ্ছেদের বিনিময়ে রাজস্ব অর্জনের পরিকল্পনা অসাংবিধানিক ও অমানবিক।’
আদিবাসী পরিচয়ের সংকট ও প্রতিরোধ
মাওবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক শিকড় যতই বিতর্কিত হোক না কেন, আদিবাসীরা বারবার বলেছে, তাদের মূল লড়াই জমি, বন ও জল রক্ষার জন্য। সংবিধানের পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী, আদিবাসী এলাকার জমি, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের জন্য গ্রাম পরিষদের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু সরকার বারবার এই নিয়ম অমান্য করে আদিবাসীদের ভূখণ্ডকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিয়েছে।
ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং একবার বলেছিলেন, ‘নকশালবাদ হলো ভারতের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি।’ সেই সময় শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’, যার আওতায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হয়। আজ মোদী সরকারের অধীনে এই অভিযান আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। কিন্তু আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যেটি দাঁড়িয়েছে সেটি হলো ভারতের এই অভিযান কি আদিবাসীদের জন্য নিরাপত্তা আনছে, নাকি তাদের জীবন আরও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে?
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা