এরদোগানের ‘বিপজ্জনক’ পররাষ্ট্রনীতি

এতদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান এবং ন্যাটোর সার্বিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছিল তুরস্কের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এর কারণ ছিল স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থায় জাতীয় নিরাপত্তা সংকট, প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সমীকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক টানাপোড়েন। নতুন বিশ্ব-পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তুরস্কের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা এক কঠিন সমস্যা ছিল। সবারই এটা জানা কথা যে, স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে দ্বৈত  বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে তুরস্ক ছিল ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাকের ডগায় দেশটির অবস্থান হওয়ায় এবং ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণকারী হওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্যের কাছে তুরস্ক তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙন তুরস্কের জন্য নতুন পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় নতুন করে পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজাতে হয়। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তুরস্ক আরো পাশ্চাত্যমুখী হওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত পূরণে কতিপয় অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করে। এই সময়ে দেশটি ন্যাটো কার্যক্রমে অংশগ্রহণও জোরদার করে। আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর পক্ষে অংশগ্রহণ করেও তুরস্ক পাশ্চাত্যের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এই এক যুগের অন্তর্বর্তীকালীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে না পারার ব্যর্থতা তুরস্কের জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা নীতিগত পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্কের এই উপলব্ধি ঘটে যে, তার মুসলিম চরিত্র ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতির নতুন বিন্যাস শুরু হয় এরদোগানের ক্ষমতা গ্রহণের আগেই—তুরগত ওজালের সময়। ২০০৩ সালে এরদোগান যখন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন তখন পাশ্চাত্যের বদলে প্রাচ্যমুখী পররাষ্ট্রনীতি আরো দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়। এরই সর্বশেষ ধারাবাহিকতায় তুরস্ক গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করে রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিবিসি এবং তুরস্কের দৈনিক সাবাহ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ যুক্তরাষ্ট্রের নানা হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তুরস্কে পৌঁছেছে। ১২ জুলাই এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রথম চালান আঙ্কারায় পৌঁছায়। রাশিয়া তুরস্কে এ চালান পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে, চালানটি আঙ্কারার একটি বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, শুরু থেকেই তুরস্কের বিমানবিধ্বংসী এই রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয়ের পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আসছে। অত্যাধুনিক এই অস্ত্রটি কিছুতেই যাতে এরদোগানের হাতে না পড়ে সেজন্য নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল ওয়াশিংটন। রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র নিলে প্রতিশ্রুত মার্কিন এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান সরবরাহ করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালান তুরস্কে পৌঁছানোর পর সব হুমকিই কার্যত ব্যর্থ হয়ে গেল। তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ। কিন্তু এরদোগান অনুসৃত পুনর্গঠিত পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্ক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান কেনার জন্য তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। এই কর্মসূচিতে তুরস্ক প্রচুর বিনিয়োগ করে রেখেছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে তুরস্কের কোম্পানিগুলো বিমানের ৯৩৭টি খণ্ডাংশ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে এ ধরনের অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও তুরস্ক ক্রমাগত আরো বেশি স্বাধীন প্রতিরক্ষানীতির পথে হাঁটছে। তুরস্ক ২৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে রাশিয়ার অত্যাধুনিক এস-৪০০ বিমান কেনা ছাড়াও এ ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এস-৪০০ ক্ষেপাণাস্ত্র ব্যবস্থা এই অঞ্চলে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে না। তারা বলছেন, এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান এবং এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র-ব্যবস্থা কাছাকাছি থাকা ঠিক হবে না। এতে রুশ টেকনিশিয়ানদের এফ-৩৫-এর দুর্বলতা খুঁজে বের করে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। তুরস্ক রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপাণাস্ত্র ব্যবস্থা নিলে তাদেরকে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বের করে দেওয়াসহ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রুশ প্রতিরক্ষা কেনার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এরদোগান প্রশাসন বলেছে, দুুটো ব্যবস্থা বসানো হবে দুটো ভিন্ন জায়গায়। তুরস্ক আরো যুক্তি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র-প্রতিশ্রুত আরেকটি বিকল্প ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা যথাসময়ে প্রদানে ব্যর্থ হলে তারা একরকম বাধ্য হয়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে।

তুরস্কের অনুসৃত নতুন পররাষ্ট্রনীতির আর একটি দিক হলো অতীতের বিবাদ-বিসংবাদ ঘুচিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন। তারা এর নাম দিয়েছে ‘শূন্য বিবাদ নীতি’। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সেই মধ্যযুগ থেকে। স্বাভাবিকভাবেই আধিপত্যকামী রুশ সম্রাজ্য এবং সম্প্রসারণশীল ‘ওসমানীয় সালতানাত’-এর মধ্যে সম্পর্ক ভালো থাকার কোনো কারণ ছিল না। দীর্ঘকালব্যাপী এই দুই বৃহত্ প্রতিবেশীর যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল। অতিসম্প্রতি ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক হ্রাস পেতে শুরু করলে রাশিয়ার দিকে ফিরে তাকান এরদোগান। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক আন্তর্জাতিক ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। দুই নেতা সফর বিনিময় করেন। তারা বহুমুখী সহযোগিতায় সম্মত হন। আঞ্চলিক বিরোধ নিরসনে দুই পক্ষের সমঝোতা লক্ষ করা যায়। তুরস্কের উল্লেখযোগ্য প্রধান প্রতিবেশী গ্রিসের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। গ্রিক-তুরস্ক গ্যাসলাইন স্থাপিত হয়। সাইপ্রাসকেন্দ্রিক বিরোধে এরদোগান গণভোটের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি তুর্কি সাইপ্রিয়টদের প্রতি শক্ত সমর্থন অব্যাহত রাখেন। তুরস্কের প্রতিবেশী ইরাকের সঙ্গে বিরোধের প্রধান কারণ কুর্দি সমস্যা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ২০১১ সালে এরদোগান ইরাকের কুর্দি অঞ্চল সফর করেন। এর আগে ২০০৯ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ইরাক সফর করেন। বিগত ৩৩ বছরের মধ্যে এটি ছিল কোনো তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রথম ইরাক সফর। বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক বিরোধ মীমাংসায় দুটি দেশ একত্রে কাজ করছে। এরদোগান কুর্দিদের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করলেও বিদেশি হস্তক্ষেপে সম্পূর্ণ শান্তি অর্জিত হয়নি বলে অভিযোগ তুরস্কের। সিরিয়া হচ্ছে আরেকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যার সঙ্গে তুরস্কের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এরদোগানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিরোধ পরিণত হয় বন্ধুত্বে। সিরিয়ার বিগত ১১ বছরের গৃহযুদ্ধের সময়কালে তুরস্ক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। পাশ্চাত্যের বিরোধিতা সত্ত্বেও এরদোগান বাশারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন। ইসলামি জঙ্গি তথা আইএস এর প্রতি এরদোগান কঠোর মনোভাব পোষণ করেন। তাদের দমনে যথার্থ সহযোগিতা দেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে এরদোগানের সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা লক্ষ করা যায় ইরান-কাতার প্রশ্নে। এখন ইরানের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের যে অব্যাহত অবরোধ চলছে তার নিন্দা করেছেন তিনি। সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতারের বিরুদ্ধে যে কার্যক্রম চলছে তার কঠোর নিন্দা করেন এরদোগান। কাতারকে যাবতীয় সায়-সাহায্য দিয়ে অবরোধ অকার্যকর করার ক্ষেত্রে তিনি অসম্ভব সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিহত হলে জনাব এরদোগান সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেন। তুরস্ক যদিও মুসলিম রাষ্ট্র, পাশ্চাত্যের কারণে ইসরাইলের সঙ্গে ছিল চমত্কার সম্পর্ক। এরদোগান ক্ষমতাসীন হলে ইসরাইলবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলে অভিহিত করেন। জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরিত হলে সাম্প্রতিক কালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন দূতাবাস সেখানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা—ওআইসি এর শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করেন।

বিশ্বের যেখানেই মুসলিম জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এরদোগান প্রশাসন দ্বিধাহীনভাবে তার নিন্দা করছেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যখন মিয়ানমার কর্তৃক বাংলাদেশে বিতাড়িত হয় তখন আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে এরদোগান খুব কঠোর ভাষায় এর নিন্দা করেন। মিসেস এরদোগান রোহিঙ্গাদের অবস্থান সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশে আসেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।

পাশ্চাত্যে এবং প্রাচ্যে এরদোগানের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে কার্যকর ও গণমুখী হয়ে উঠেছে সেখানে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যবহার করছে। মার্কিন নেতৃত্ব এরদোগান সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করছে। চীনও বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে না। ইসরাইল প্রকাশ্যে এরদোগানের নিন্দা করছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কূটনৈতিক মহল এরদোগানের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ‘বিপজ্জনক’ মনে করছে। একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জেমস এম ডরসি এরদোগানের এসব কার্যক্রমকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াখেলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তুরস্ক এবং এর নেতৃত্ব এসব বিপদ-আপদকে অতিক্রম করার সাহস ও শক্তি রাখে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়